কলকাতা: লিওনেল মেসির কলকাতা সফর ঘিরে তৈরি হওয়া বিশৃঙ্খলা ও জনরোষ এখন শুধুমাত্র প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই (Messi Kolkata incident)। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে একের পর এক রাজনৈতিক আক্রমণ শুরু হয়েছে। এবার সরাসরি রাজ্য সরকারের উপর তীব্র আক্রমণ শানালেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। তাঁর কণ্ঠে ধরা পড়েছে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা এবং প্রতিবাদের সুর।
শুভঙ্কর সরকার স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যুবভারতী ক্রীড়াঙ্গনে যা ঘটেছে, তা “ভয়াবহ অব্যবস্থাপনা এবং আইনশৃঙ্খলার চরম উপহাস।” তাঁর মতে, এটি শুধুমাত্র কোনও ইভেন্টের ব্যর্থতা নয়, বরং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের চরম অযোগ্যতার নগ্ন উদাহরণ। তিনি বলেন, “এই ঘটনার দায় শুধু আয়োজকদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। প্রশাসন, পুলিশ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব—সকলেই এই ব্যর্থতার অংশ।”
কলকাতা যে ফুটবলের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কংগ্রেস সভাপতি বলেন, “কলকাতা ফুটবলের সমার্থক। এই শহরের ফুটবল ইতিহাস শুধু রাজ্যের নয়, দেশের গর্ব। সেই শহরেই হাজার হাজার নিরীহ ফুটবলপ্রেমীকে প্রতারিত করা হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, মেসির নাম ব্যবহার করে রাজ্যের সাধারণ মানুষের কাছে চড়া দামে টিকিট বিক্রি করা হয়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মানুষরাই বঞ্চিত হন।
শুভঙ্কর সরকারের দাবি, যখন লিওনেল মেসি সল্টলেক স্টেডিয়ামে পৌঁছান, তখন মাঠে সাধারণ দর্শকদের কোনও জায়গা ছিল না। “মেসিকে ঘিরে রেখেছিল শুধুমাত্র তৃণমূল কংগ্রেসের রাজনীতিবিদ এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। সাধারণ দর্শকরা দূরে বসে জায়ান্ট স্ক্রিনে দেখেছেন—যে দৃশ্য বাড়িতে বসেও দেখা যেত,” বলেন তিনি।
আরও তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে তিনি বলেন, “আসলে কোটি কোটি টাকা খরচ করে মেসিকে কলকাতায় আনা হয়েছিল তৃণমূল নেতাদের সেলফি তোলার জন্য। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছবি পোস্ট করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যেই পুরো আয়োজন।”
শুভঙ্করের মতে, এটি মানুষের আবেগের সঙ্গে নিষ্ঠুর প্রতারণা। এই ঘটনার তুলনা টেনে তিনি বলেন, “সারদা-নারদার পর এটিই তৃণমূল কংগ্রেসের নতুন যুগের কেলেঙ্কারি।” তাঁর অভিযোগ, ভক্তদের সময়, অর্থ এবং আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হয়েছে। যারা জীবনের সঞ্চয় ভেঙে, কেউ কেউ ধার করে টিকিট কেটেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছে।
শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যেই থামেননি শুভঙ্কর সরকার। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, “লোকদেখানো তদন্ত বা প্রতীকী বিচার যথেষ্ট নয়।” তাঁর মতে, এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেককে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করতে হবে। তালিকায় তিনি নাম করেন আয়োজক সংস্থা, বিধাননগর পুলিশ, রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী, স্থানীয় বিধায়ক এবং প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্তারা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এই মন্তব্যের ফলে মেসি কাণ্ড আরও গভীর রাজনৈতিক বিতর্কে ঢুকে পড়ল। একদিকে বিজেপি, অন্যদিকে কংগ্রেস দু’দিক থেকেই তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে চাপ বাড়ছে। শাসক দলের পক্ষ থেকে এখনও এই অভিযোগগুলির বিস্তারিত জবাব মেলেনি।
সব মিলিয়ে, মেসির সফর যা হওয়ার কথা ছিল ফুটবলপ্রেমীদের উৎসব, তা পরিণত হয়েছে রাজ্যের প্রশাসন ও রাজনীতির বিরুদ্ধে এক বৃহৎ অভিযোগপত্রে। প্রশ্ন একটাই এই ঘটনার দায় আদৌ কেউ নেবে, না কি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সব চাপা পড়ে যাবে?
