কলকাতা, ২৯ নভেম্বর: মালদায় ২০১৭ সালের প্রলয়ংকরী বন্যার পর বরাদ্দ করা প্রায় ১০০০ কোটি টাকার ত্রাণ তহবিলের অপব্যবহার নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা আজ কলকাতা হাইকোর্টের নয়া মোড় নিয়েছে। আদালত কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (ক্যাগ)-কে তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে এবং বিলম্বের কারণে ব্যাখ্যা চেয়েছে। প্রকাশিত প্রাথমিক ক্যাগ প্রতিবেদনে বিপুল পরিমাণ জালিয়াতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যাতে ৮০-এর বেশি পঞ্চায়েত প্রধান ও কর্মকর্তার নাম জড়িয়ে আছে।
এই ঘটনা রাজনৈতিক মহলে ঝড় তুলেছে, বিশেষ করে তৃণমূল কংগ্রেসের ‘ত্রাণ বিতরণ মডেল’-কে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ২০১৭ সালের বন্যায় মালদার লক্ষ লক্ষ মানুষের বাড়িঘর উজাড় হয়ে যায়। সরকার ১০০০ কোটি টাকারও বেশি ত্রাণ তহবিল বরাদ্দ করে, কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, এই অর্থের একটি বড় অংশ আসল ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছায়নি। বরং, এই অর্থগুলো কিছু নির্দিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সাইফন করা হয়েছে।
একটি পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশন (পিআইএল) এই বিষয়ে আদালতে দায়ের হয়, যাতে বলা হয়েছে যে, পঞ্চায়েত স্তরের কর্মীরা এই অপব্যবহারের মূলে রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হাজার হাজার উপকারীদের একই মোবাইল নম্বর বা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা হয়েছে, যা স্পষ্টতই জালিয়াতির ইঙ্গিত।আদালতের একজন বিচারপতি বেঞ্চ বলেছেন, “এটা শুধু অর্থের অপব্যবহার নয়, এটা লোকজনের জীবনের সঙ্গে খেলা।
SIR খসড়া তালিকা প্রকাশে লালবাজারের বাড়তি নিরাপত্তা প্রস্তুতি
বন্যার ক্ষতিগ্রস্তরা আজও ত্রাণের জন্য অপেক্ষায় আছে, আর অর্থগুলো কোথায় গেল?” পিটিশনে দাবি করা হয়েছে যে, ৮০-এর বেশি পঞ্চায়েত প্রধান এবং স্থানীয় কর্মকর্তা এই র্যাকেটে জড়িত। এদের মধ্যে অনেকেই তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ। একজন স্থানীয় বন্যা ক্ষতিগ্রস্ত বলছেন, “আমরা বাড়ি গাঁথতে পারিনি, কিন্তু শুনছি আমাদের নামে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। কোথায় গেল সেই টাকা? আমরা তো কিছু পাইনি।” ক্যাগের প্রথম প্রতিবেদন এই দুর্নীতির মাত্রা আরও স্পষ্ট করে।
এতে বলা হয়েছে যে, ৫৮ কোটি টাকার বাড়ি পুনর্নির্মাণ তহবিলসহ মোট ১০০০ কোটির অর্থে অনিয়মের ছাপ রয়েছে। উপকারীদের তালিকায় জাল নাম যোগ করা, একই অ্যাকাউন্টে একাধিক লেনদেন এসবের মাধ্যমে অর্থ সাইফন করা হয়েছে। আদালত ২০২৩ সালেই ক্যাগকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়নি। এখন হাইকোর্ট জিজ্ঞাসা করেছে, “তদন্ত শেষ হয়েছে, তাহলে প্রতিবেদন কেন লুকিয়ে রাখছেন? এটা জনগণের অধিকার।”
পরবর্তী শুনানি ১৫ ডিসেম্বর নির্ধারিত, যেখানে ক্যাগকে ব্যাখ্যা জমা দিতে হবে।এই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আদালত বলেছে যে, সম্ভাব্য অপরাধীদের নামও চিহ্নিত হয়েছে। কিন্তু সেই তালিকা প্রকাশ না করায় বিতর্ক উঠেছে। বিজেপির একজন নেতা বলছেন, “এটা তৃণমূলের দুর্নীতির আরেকটা নমুনা। বন্যার নামে অর্থ সংগ্রহ করে নিজেরা লুটছে।” অন্যদিকে, তৃণমূল নেতারা বলছেন, “এটা পুরনো অভিযোগের পুনরাবৃত্তি। আমরা ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করেছি।”
এই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে নতুন ঝড় তুলেছে। বিরোধী দলগুলো তৃণমূল কংগ্রেসের উপর আক্রমণ চালিয়েছে। “এটাই টিএমসির ত্রাণ বিতরণের মডেল? আসল ক্ষতিগ্রস্তরা শূন্য পায়, আর অর্থ র্যান্ডম অ্যাকাউন্টে চলে যায়,” বলছেন একজন বিজেপি সাংসদ। এটা কেবল মালদার ঘটনা নয়, আগের আমফান চক্রবাতের ত্রাণ দুর্নীতির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে ছবিটা আরও ভয়াবহ। সেই সময়ও ক্যাগ তদন্তে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল, যেখানে তৃণমূলের নেতাদের নাম জড়িয়েছিল।
