কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ: মুর্শিদাবাদের বেলডাঙায় ‘দুর্গা অঙ্গন’ প্রকল্প ঘিরে (Dilip Ghosh)জমি-বিতর্ক নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। এই বিতর্কে সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করলেন বিজেপি নেতা দিলীপ ঘোষ।
তিনি অভিযোগ করেন, ভোটের অঙ্ক কষেই একদিকে দুর্গা মন্দির নির্মাণের উদ্যোগ, অন্যদিকে মুসলিম ভোট পেতে বাবরি মসজিদের অনুকরণে স্থাপনা গড়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। দিলীপ ঘোষের কড়া মন্তব্য, “বেলডাঙায় বাবরি মসজিদের পিছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথা কাজ করছে।”
দিলীপ ঘোষ বলেন, “ভোট এলেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ধর্মকে সামনে এনে রাজনীতি করেন। কখনও হিন্দুদের মন পেতে দুর্গা মন্দির, আবার মুসলিমদের মন জোগাতে বাবরি মসজিদের মতো কিছু বানানোর চেষ্টা এই দ্বিচারিতা বাংলার মানুষ এখন বুঝে গিয়েছে।” তাঁর দাবি, দুর্গা অঙ্গন প্রকল্পের নামে যে জমি নেওয়া হয়েছে, সেই জমি নিয়ে একাধিক আইনি মামলা চলছে এবং বহু মানুষ এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি।
বিজেপি নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, বেলডাঙার এই প্রকল্প নিয়ে স্থানীয় স্তরে ক্ষোভ ক্রমশ বাড়ছে। তিনি বলেন, “অনেক পরিবার তাদের জমি হারিয়েছে। কিন্তু সরকার ক্ষতিপূরণ দেয়নি। আদালতে মামলা চলছে। এই পরিস্থিতিতে কোনও ধর্মীয় বা সামাজিক প্রকল্প জোর করে চাপিয়ে দেওয়া অনৈতিক এবং বেআইনি।” দিলীপ ঘোষের দাবি, আগে জমি সংক্রান্ত জটিলতা মেটানো উচিত, তার পর উন্নয়নের কথা বলা উচিত।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস নির্বাচনের আগে পরিকল্পিতভাবে ধর্মীয় আবেগ উসকে দেয়। “কখনও রামনবমী, কখনও দুর্গাপুজো, আবার কখনও সংখ্যালঘু তোষণের রাজনীতি সবটাই ভোটের স্বার্থে। উন্নয়ন নয়, একমাত্র লক্ষ্য ক্ষমতায় টিকে থাকা,” বলেন তিনি।
বেলডাঙায় দুর্গা অঙ্গন প্রকল্প ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, এই প্রকল্পে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া মানা হয়নি। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ অভিযোগ তুলেছেন, প্রশাসনের তরফে তাঁদের সঙ্গে কোনও রকম আলোচনাই করা হয়নি। ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দেওয়া হলেও তা বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
দিলীপ ঘোষ আরও বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একদিকে নিজেকে হিন্দুদের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরতে চান, আবার অন্যদিকে মুসলিম ভোটব্যাঙ্ক শক্ত করতে বাবরি মসজিদের প্রসঙ্গ টেনে আনছেন। এটা খুব বিপজ্জনক রাজনীতি। বাংলার সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করার চেষ্টা চলছে।” তাঁর মতে, এই ধরনের বক্তব্য ও প্রকল্প রাজ্যের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে আঘাত করতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্য বিজেপির এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। শাসকদলের একাংশ নেতার বক্তব্য, দুর্গা অঙ্গন প্রকল্প মূলত সাংস্কৃতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এবং এর সঙ্গে কোনও সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য জড়িত নেই। তাঁদের দাবি, বিজেপি ইচ্ছাকৃতভাবে বিষয়টিকে ধর্মীয় রং দিয়ে উত্তেজনা ছড়াতে চাইছে।
রাজনৈতিক মহলের মতে, বেলডাঙার এই বিতর্ক আসন্ন নির্বাচনের আগে আরও বড় আকার নিতে পারে। কারণ মুর্শিদাবাদ জেলায় সংখ্যালঘু ও সংখ্যাগরিষ্ঠ—দুই সম্প্রদায়ের ভোটই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুর্গা অঙ্গন প্রকল্প ঘিরে জমি বিতর্ক, ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ এবং ধর্মীয় ইস্যু মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, দিলীপ ঘোষের এই মন্তব্য নিছক রাজনৈতিক আক্রমণ নয়, বরং বিজেপির বৃহত্তর কৌশলের অংশ। তৃণমূলের বিরুদ্ধে ‘তুষ্টিকরণ রাজনীতি’ ও ‘দ্বিচারিতা’র অভিযোগ তুলে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে, তৃণমূল নেতৃত্ব চাইছে উন্নয়ন ও সামাজিক প্রকল্পের কথা তুলে ধরে বিরোধীদের অভিযোগ খণ্ডন করতে।
সব মিলিয়ে, বেলডাঙার দুর্গা অঙ্গন প্রকল্প এখন শুধু একটি স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্প নয়, বরং রাজ্য রাজনীতির এক নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দিলীপ ঘোষের “বাবরি মসজিদের পিছনে মমতার মাথা” মন্তব্য এই বিতর্ককে আরও তীব্র করেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। আগামী দিনে এই ইস্যু নিয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আদালতের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক পাল্টা বক্তব্য পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকেই নজর থাকবে রাজ্যবাসীর।
