সিপিএমের পার্টি অফিস দখলের চেষ্টা প্রোমোটার-ভাড়াটের! সাহায্যের আশ্বাস তৃণমূলের

cpim-party-office-occupation-dispute-guskara

পূর্ব বর্ধমানের গুসকরায় সিপিএমের (CPIM)পুরনো পার্টি অফিস ঘিরে শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক ও আইনি টানাপোড়েন। যে ভবন এক সময় দলের সাংগঠনিক প্রাণকেন্দ্র ছিল, সেই তিনতলা ‘রবীন সেন ভবন’ আজ দখল ফিরে পেতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠছে সিপিএমের।

Advertisements

অভিযোগ, পার্টি অফিসটি ভাড়া নেওয়া প্রোমোটার ও তাঁর সহযোগীরা লিজ়ের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার বহু বছর পরেও ভবন খালি করছেন না। উল্টে, ভবন ছাড়তে অনিচ্ছা প্রকাশ করে কার্যত দখলদারির পথে হাঁটছেন বলে দাবি সিপিএমের।

   

গুসকরা শহরের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের লজপাড়ায় অবস্থিত এই ভবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। ১৯৯৯ সালের মে মাসে তৎকালীন রাজ্য মন্ত্রী বিনয়কৃষ্ণ চৌধুরীর হাত ধরে উদ্বোধন হয় ‘রবীন সেন ভবন’-এর। সেই সময় গুসকরা শহর ও সংলগ্ন এলাকার সিপিএমের সমস্ত সাংগঠনিক কাজকর্ম পরিচালিত হত এই ভবন থেকেই। প্রতিদিন দলীয় কর্মী, সমর্থকদের ভিড়ে মুখর থাকত পার্টি অফিস চত্বর। মিটিং, আলোচনা, আন্দোলনের প্রস্তুতি সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই তিনতলা ভবন।

এবার থেকে নেগেটিভ মার্কস পেলেও হওয়া যাবে ডাক্তার

কিন্তু ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বদলাতে শুরু করে পরিস্থিতি। ক্ষমতা হারানোর পর তহবিল সংকটে পড়ে সিপিএম। ধীরে ধীরে অনেক পার্টি অফিসই কার্যত বন্ধ হয়ে যায় বা বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে বাধ্য হয় দল। গুসকরার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।

দলের স্থানীয় নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয়, আপাতত পার্টি অফিসটি ভাড়া দিয়ে সংগঠনের খরচ তোলার চেষ্টা করা হবে। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে গুসকরারই বাসিন্দা, পেশায় প্রোমোটার স্বপন পালের সঙ্গে চুক্তি হয়। চুক্তি অনুযায়ী বছরে ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকায় ১২ মাসের জন্য তিনতলা ভবনটি লিজ় দেওয়া হয়।

সমস্যার সূত্রপাত সেখান থেকেই। সিপিএমের অভিযোগ, চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ভাড়াটে ভবন ছাড়েননি। এমনকি ২০২২ সালের জানুয়ারি পেরিয়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতেও ভবন দখলে রয়েছে। দলের দাবি, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ভাড়াটেকে জানানো হয়েছিল যে লিজ় আর নবীকরণ করা হবে না। একাধিকবার মৌখিক ও লিখিত ভাবে ভবন খালি করার অনুরোধ জানানো হলেও তাতে কোনও কাজ হয়নি।

গুসকরা শহর সিপিএমের এরিয়া কমিটির সম্পাদক ইরফান শেখ বলেন, “দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয়েছিল লিজ় আর বাড়ানো হবে না। সেই কথা আগেভাগেই ভাড়াটেকে জানানো হয়। তাঁকে ভবন খালি করে বকেয়া ভাড়া মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ভবন ফেরত না পেলে আমরা বড় আইনি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হব।”

অন্যদিকে, সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ভাড়াটে স্বপন পাল। তাঁর দাবি, তিনি একাধিকবার সিপিএমের স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করে লিজ় নবীকরণের আবেদন জানিয়েছেন, কিন্তু কোনও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। ভবন দখল করে রাখার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “লিজ় নবীকরণ হলে আমি সমস্ত বকেয়া ভাড়া মিটিয়ে দেব। ভবিষ্যতেও নিয়ম মেনে ভাড়া দিতে প্রস্তুত। চুক্তির মেয়াদকালে নিয়মিত ভাড়া দিয়েছি, তার সমস্ত রসিদ আমার কাছে রয়েছে।” তাঁর কথায় স্পষ্ট, সহজে ভবন ছাড়ার ইচ্ছা তাঁর নেই।

এই ভাড়াটে-বিবাদকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক চাপানউতোরও শুরু হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনা নিয়ে কটাক্ষ করতে ছাড়েনি। তৃণমূল নেতা বাগবুল ইসলামের মন্তব্য, “এক সময় সিপিএম অন্যের ব্যক্তিগত সম্পত্তির সমস্যায় বিনা অনুমোদনে মধ্যস্থতা করত। আজ নিজেরাই সেই সমস্যায় পড়েছে। তারা পুঁজি বোঝে বলেই পার্টি অফিস ভাড়া দিয়েছিল, এখন সেই পুঁজির খেলাতেই আটকে গেছে।” যদিও একই সঙ্গে তিনি বলেন, “সিপিএম চাইলে পুরসভার মাধ্যমে বিষয়টি মীমাংসায় সহযোগিতা করা যেতে পারে।”

যে ভবন একসময় দলীয় শক্তির প্রতীক ছিল, তহবিল জোগাড়ের আশায় সেটি ভাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্তই আজ সিপিএমের কাছে গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইনি লড়াইয়ের পথে হাঁটার ইঙ্গিত দিয়ে দল জানাচ্ছে, সংগঠনের পুরনো ঘাঁটি উদ্ধার করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। রাজনৈতিক দুর্বলতা, আর্থিক সংকট ও আইনি জটিলতার মাঝে পড়ে ‘রবীন সেন ভবন’ যেন গুসকরার রাজনীতির এক নতুন প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements