১ বছরে ৬ হাজার কোটির বেশি চাঁদা তুলেছে বিজেপি

নয়াদিল্লি: নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর প্রথম পূর্ণ আর্থিক বছরে (BJP donation amount 2024-25)দেশের রাজনৈতিক দলগুলির তহবিল সংগ্রহের যে চিত্র প্রকাশ্যে এল, তা কার্যত…

bjp-donation-amount-2024-25

নয়াদিল্লি: নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর প্রথম পূর্ণ আর্থিক বছরে (BJP donation amount 2024-25)দেশের রাজনৈতিক দলগুলির তহবিল সংগ্রহের যে চিত্র প্রকাশ্যে এল, তা কার্যত নতুন করে রাজনৈতিক অর্থনীতির বিতর্ক উসকে দিল। নির্বাচন কমিশনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে শাসক দল বিজেপি যে পরিমাণ অনুদান পেয়েছে, তা শুধু বিরোধী দলগুলিকেই নয়, রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও অবাক করেছে।

Advertisements

এক বছরে বিজেপির ঘরে এসেছে মোট ৬,০৮৮ কোটি টাকা। সেখানে দেশের অন্যতম প্রাচীন দল কংগ্রেস সংগ্রহ করতে পেরেছে মাত্র ৫২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ চাঁদার অঙ্কে বিজেপি কংগ্রেসের তুলনায় প্রায় ১২ গুণ এগিয়ে।

   

৫২২ কোটি চাঁদা তুলেছে কংগ্রেস, বিজেপির অঙ্ক অবাক করবে

নথি অনুযায়ী, বিজেপির এই বিপুল তহবিল সংগ্রহ আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৩ শতাংশ বেশি। নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর অনেকেই ধারণা করেছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলির কাছে বড় অঙ্কের কর্পোরেট অনুদান কমবে। কারণ, বন্ড ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচয় গোপন রেখে চাঁদা দেওয়ার সুযোগ আর থাকছে না। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সেই ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হয়েছে। বরং বন্ড উঠে যাওয়ার পরেও বিজেপির চাঁদা সংগ্রহে কোনও ধাক্কা লাগেনি—উল্টে তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

অন্যদিকে, কংগ্রেস শিবিরে এই পরিসংখ্যান ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একদিকে, ৫০০ কোটির বেশি অনুদান সংগ্রহকে দল ইতিবাচক হিসেবেই তুলে ধরতে চাইছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের দাবি, নির্বাচনী বন্ড বাতিল হওয়ার ফলে রাজনৈতিক অর্থায়নে স্বচ্ছতা বেড়েছে এবং এখন তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক ছোট দাতা এগিয়ে আসছেন। তবে একই সঙ্গে তাঁরা এটাও স্বীকার করছেন যে বিজেপির সঙ্গে এই বিপুল আর্থিক ফারাক আগামী দিনে নির্বাচনী লড়াইয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

বিজেপির প্রাপ্ত এই বিপুল অনুদান ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক বিতর্ক তুঙ্গে। বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, এই অর্থ আসলে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা শিল্পপতি ও বড় কর্পোরেট গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে দেওয়া “কৃতজ্ঞতা” বা ভবিষ্যৎ সুবিধার প্রত্যাশায় করা বিনিয়োগ। সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই একে “চুক্তির বিনিময়ে চাঁদা” বলে কটাক্ষ করছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকারে থাকার সুবাদে বিজেপি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে বলেই বড় ব্যবসায়ী মহল তাদের দিকেই ঝুঁকছে।

তবে বিজেপি এই অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে খারিজ করেছে। দলের নেতাদের দাবি, এই বিপুল অনুদান আসলে দেশের শিল্প ও বাণিজ্য মহলের আস্থার প্রতিফলন। তাঁদের মতে, বিজেপির নেতৃত্বাধীন সরকার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতি নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার বার্তা দিতে পেরেছে বলেই দাতারা নির্দ্বিধায় অর্থ দিচ্ছেন। বিজেপির যুক্তি, কংগ্রেসের তুলনায় তাদের সংগঠন অনেক বেশি শক্তিশালী, মাঠপর্যায়ে কর্মীসংগঠন সক্রিয় এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাও বেশি যার ফলেই এই আর্থিক সমর্থন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই চাঁদার বৈষম্য কেবল বিজেপি ও কংগ্রেসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই তুলে ধরে। বিজেপি বর্তমানে শুধু ক্ষমতাসীন দল নয়, বরং প্রযুক্তিনির্ভর প্রচার, তথ্য বিশ্লেষণ, সোশ্যাল মিডিয়া কৌশল এবং বিশাল জনসভা আয়োজনের ক্ষেত্রেও অনেক এগিয়ে। বিপুল তহবিলের জোরে তারা বুথ স্তর পর্যন্ত সংগঠন মজবুত করতে পারছে। অন্যদিকে, কংগ্রেসকে তুলনামূলকভাবে সীমিত সম্পদের মধ্যেই লড়াই চালাতে হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটে বড় প্রশ্ন উঠছে নির্বাচনী বন্ড ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পরেও রাজনৈতিক অর্থায়নে কি সত্যিই ভারসাম্য আসছে? নাকি বাস্তবে ক্ষমতাসীন দলের দিকেই স্বাভাবিকভাবে ঝুঁকে থাকছে দাতাদের আস্থা? অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, আইন বদলালেও রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীভবনের বাস্তবতা খুব একটা বদলায়নি।

সব মিলিয়ে নির্বাচন কমিশনের এই তথ্য নতুন করে রাজনৈতিক অর্থায়নের স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ এবং গণতন্ত্রে অর্থের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা জোরদার করেছে। কংগ্রেসের ৫২২ কোটি টাকা যেখানে টিকে থাকার লড়াইয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে, সেখানে বিজেপির ৬ হাজার কোটির বেশি অনুদান দেশের রাজনীতিতে অর্থ ও ক্ষমতার গভীর সম্পর্ককে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। আগামী নির্বাচনে এই আর্থিক ফারাক ভোটের ফলাফলে কতটা প্রভাব ফেলবে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক মহল ও সাধারণ মানুষ।

Advertisements