দেশের রাজনীতিতে সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্কের সমীকরণ নতুন করে বদলে দিতে শুরু করেছে আসাদউদ্দিন ওয়াইসির নেতৃত্বাধীন অল ইন্ডিয়া মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিন (AIMIM)। বিহার বিধানসভা নির্বাচন এবং মহারাষ্ট্রের পুরসভা ভোটে মিমের সাম্প্রতিক সাফল্য কংগ্রেসের অন্দরমহলে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। কংগ্রেস নেতৃত্বের এক সংখ্যালঘু শীর্ষ নেতা ‘ইন্ডিয়া টুডে’-কে স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন, “এখনও পর্যন্ত মিমের উত্থান কংগ্রেসের চেয়ে আরজেডি, এসপি, জেডিইউ, তৃণমূল কংগ্রেস ও এনসিপির মতো আঞ্চলিক দলগুলোকেই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। কিন্তু এই ধারা চললে খুব শীঘ্রই কংগ্রেসও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।”
বিহারের শিক্ষা, যা উপেক্ষিত
বিহারে নির্বাচনের আগে মহাগঠবন্ধনে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য বারবার আবেদন জানিয়েছিল AIMIM। মাত্র পাঁচটি আসনের দাবি ছিল ওয়াইসির। কিন্তু কংগ্রেস ও আরজেডি সেই প্রস্তাব নাকচ করে মিমকে বিজেপির ‘বি-টিম’ বলে দাগিয়ে দেয়। ফলাফল সামনে আসতেই অস্বস্তি বাড়ে—কংগ্রেস যেখানে মাত্র ছ’টি আসনে জয় পায়, সেখানে AIMIM একাই পাঁচটি আসন জিতে নেয় এবং আরও একাধিক আসনে মহাগঠবন্ধনের ক্ষতি করে।
কংগ্রেস নেতার দাবি, সীমাঞ্চল অঞ্চলে—যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা বেশি এবং আর্থ-সামাজিকভাবে এলাকা পিছিয়ে—মিমের উন্নয়নকেন্দ্রিক প্রচার কংগ্রেসের ‘ভোট ভাগ হলে বিজেপি জিতবে’ বক্তব্যের চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে। এতে কংগ্রেসের ঐতিহ্যগত সংখ্যালঘু মোবিলাইজেশনের সীমাবদ্ধতা প্রকাশ্যে এসেছে।
মহারাষ্ট্রে অস্বস্তি আরও গভীর
মহারাষ্ট্রের পুরসভা ও বৃহন্মুম্বই পুরনিগম (বিএমসি) নির্বাচনে মিমের সাফল্য কংগ্রেসের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে। ১৩টি পুরনিগমে মোট ১২৪টি আসন জিতে কংগ্রেসকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পিছনে ফেলেছে AIMIM। ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে মিম পেয়েছে ৩৩টি আসন, যেখানে কংগ্রেস অনেকটাই পিছিয়ে।
বিদর্ভে ২১টি, মালেগাঁওয়ে ২১টি, নান্দেদে ১৪টি, ধুলেতে ১০টি এবং সোলাপুরে ৮টি আসন জিতে মিম নিজের শক্ত ঘাঁটি বিস্তার করেছে। মুম্বইয়ে আটজন কর্পোরেটর জিতে তারা এনসিপির উভয় গোষ্ঠী ও এমএনএস-কেও ছাপিয়ে যায়। এমনকি গোভান্ডি–মানখুর্দ বেল্টে প্রবেশ করে মিম, যা এতদিন সমাজবাদী পার্টির নেতা আবু আজমির শক্ত ঘাঁটি বলে পরিচিত ছিল।
নতুন সমীকরণ, পুরনো আশঙ্কা
বিহার ও মহারাষ্ট্রের সাফল্যের পর AIMIM এখন অসম ও পশ্চিমবঙ্গে সংগঠন বিস্তারের দিকে নজর দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে, অসমে বদরুদ্দিন আজমলের দল এবং বাংলায় আব্বাস সিদ্দিকির ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের সঙ্গে কৌশলগত বোঝাপড়া হতে পারে। তা হলে কংগ্রেস ও তার মিত্রদের সমস্যা আরও বাড়বে বলেই মত বিশেষজ্ঞদের।
সবচেয়ে বেশি দুশ্চিন্তায় রয়েছে উত্তরপ্রদেশ। সেখানে চন্দ্রশেখর আজাদ ও স্বামী প্রসাদ মৌর্যের সঙ্গে সম্ভাব্য মিম জোটের জল্পনা কংগ্রেসের অন্দরমহলে আতঙ্ক তৈরি করেছে। কংগ্রেস নেতাদের আশঙ্কা, এতে শুধু বিধানসভা সমীকরণ নয়, ২০২৯ লোকসভা নির্বাচনে INDIA জোটের ভবিষ্যৎও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
তেলেঙ্গানায় স্বস্তির নিঃশ্বাস
তবে ব্যতিক্রম তেলেঙ্গানা। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী রেবন্ত রেড্ডির সঙ্গে ওয়াইসির কার্যকর সম্পর্ক কংগ্রেসকে কিছুটা স্বস্তি দিয়েছে। জুবিলি হিলস উপনির্বাচনে AIMIM প্রার্থী না দিয়ে কংগ্রেসকে সমর্থন করায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন পুনরুদ্ধার করতে পেরেছে দল।
কৌশলগত দ্বিধা
ওয়াইসির ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক প্রভাব কংগ্রেস ও INDIA জোটকে স্পষ্টতই অস্বস্তিতে ফেলেছে। সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ক ধরে রাখতে নতুন কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে, কিন্তু প্রকাশ্যে এতদিনের অবস্থান বদলানো সহজ নয়। একদিকে বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার আশঙ্কা, অন্যদিকে সংখ্যাগুরু ভোটারের মনোভাব—এই দ্বন্দ্বেই এখন আটকে কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ পথচলা।
