
ভারতের কূটনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলকের দিকে এগোচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (PM Narendra Modi)। বিদেশ সফরের নিরিখে তিনি কার্যত ‘সেঞ্চুরি’র দোরগোড়ায়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক দশকেরও বেশি সময়ে বিশ্বের প্রায় ৭৯টি দেশ সফর করেছেন নরেন্দ্র মোদী। আগামী কয়েকটি আন্তর্জাতিক সফর সম্পন্ন হলেই বিদেশ সফরের সংখ্যা ছুঁয়ে ফেলতে পারে ১০০—যা আধুনিক ভারতের কোনও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’, ‘অ্যাক্ট ইস্ট’, ‘ইন্ডো-প্যাসিফিক ভিশন’, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর মতো নীতির মাধ্যমে ভারতের অবস্থানকে বিশ্বমঞ্চে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা চালিয়েছেন তিনি। সেই কৌশলেরই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে তাঁর ঘনঘন বিদেশ সফরে। শুধু রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে বৈঠক নয়, প্রবাসী ভারতীয়দের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সম্মেলন, প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত চুক্তি—সব ক্ষেত্রেই এই সফরগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রধানমন্ত্রী মোদী সবচেয়ে বেশি বার সফর করেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে—মোট ১০ বার। এর মাধ্যমে ভারত-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্ব নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। ফ্রান্স ও জাপানে ৮ বার করে সফর করে তিনি প্রতিরক্ষা, পরমাণু শক্তি ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে আরও জোরদার করেছেন। রাশিয়া ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে ৭ বার সফর করে পুরনো সম্পর্ককে নতুন বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি।
জার্মানি ও চিনে ৬ বার, নেপাল ও সিঙ্গাপুরে ৫ বার এবং ব্রাজিল, শ্রীলঙ্কা ও যুক্তরাজ্যে ৪ বার করে সফর করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়াও ভুটান, ইন্দোনেশিয়া, সৌদি আরব, দক্ষিণ আফ্রিকা, থাইল্যান্ড, উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলিতে একাধিকবার গিয়ে আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্ককে মজবুত করেছেন। উল্লেখযোগ্য ভাবে, বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ইতালি, কাতার, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইৎজারল্যান্ডের মতো দেশেও একাধিকবার সফর করেছেন তিনি।
একবার করে সফর করা দেশগুলির তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। অস্ট্রিয়া থেকে ভিয়েতনাম, ইজরায়েল থেকে ইরান, মিশর থেকে ফিজি, আফ্রিকার একাধিক দেশ, এমনকি ভ্যাটিকান সিটিও রয়েছে সেই তালিকায়। পাকিস্তান সফরও করেছেন একবার—যা ভারত-পাক সম্পর্কের ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই চিহ্নিত।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এই বিপুল সংখ্যক বিদেশ সফরের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী মোদী ভারতের ‘সফট পাওয়ার’ বাড়াতে বিশেষ ভূমিকা নিয়েছেন। যোগ, আয়ুর্বেদ, ভারতীয় সংস্কৃতি ও প্রবাসী ভারতীয়দের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক মঞ্চে ভারতের ভাবমূর্তি নতুনভাবে নির্মাণ করেছেন। একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি, বিদেশি বিনিয়োগ, পরিকাঠামো উন্নয়ন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের ক্ষেত্রেও এই সফরগুলির প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে।
তবে সমালোচনাও রয়েছে। বিরোধীদের একাংশের দাবি, এত ঘনঘন বিদেশ সফরের ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলি যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে না। তাঁদের প্রশ্ন, কূটনৈতিক সাফল্যের বাস্তব সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে? যদিও সরকারের পাল্টা যুক্তি, শক্তিশালী বৈদেশিক সম্পর্ক ছাড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে, বিদেশ সফরের সংখ্যায় সেঞ্চুরির দিকে এগিয়ে চলা নরেন্দ্র মোদী কেবল একটি পরিসংখ্যানের দিক থেকেই নয়, ভারতের বৈদেশিক নীতির গতিপথের প্রতীক হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। আগামী দিনে তিনি কোন কোন দেশে সফর করেন এবং সেই সফরগুলি ভারতের কূটনৈতিক অবস্থানকে কতটা শক্তিশালী করে—সেদিকেই এখন নজর গোটা বিশ্বের।










