অসমের জনবিল মেলায় উঠে এল শতাব্দী প্রাচীন প্রথা

গুয়াহাটি: টাকা সরিয়ে রেখে যদি মানুষের মধ্যে লেনদেন চলে (Jonbeel Mela)শুধু বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর পারস্পরিক নির্ভরতার উপর তাহলে কী হয়? সেই প্রশ্নের উত্তরই প্রতি বছর…

jonbeel-mela-barter-system-assam

গুয়াহাটি: টাকা সরিয়ে রেখে যদি মানুষের মধ্যে লেনদেন চলে (Jonbeel Mela)শুধু বিশ্বাস, ঐতিহ্য আর পারস্পরিক নির্ভরতার উপর তাহলে কী হয়? সেই প্রশ্নের উত্তরই প্রতি বছর চোখের সামনে এনে দেয় অসমের ঐতিহাসিক জনবিল মেলা। চলতি বছরের ২৩ জানুয়ারি, মোরিগাঁও জেলার জনবিল এলাকায় মেলার দ্বিতীয় দিনে ফের প্রাণ ফিরে পেল শতাব্দী প্রাচীন বার্টার বা বিনিময় প্রথা।

Advertisements

ভোরের আলো ফোটার সঙ্গেই শুরু হয় এই অনন্য প্রথা। গোভা দেওরাজা, অর্থাৎ তিওয়া জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী রাজা ও জনবিল মেলার রক্ষক, প্রাচীন আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সকাল প্রায় ৬টা নাগাদ আনুষ্ঠানিকভাবে এই বিনিময় পর্বের সূচনা করেন। তিন দিনের মেলার মধ্যে এটিই সবচেয়ে প্রতীকী ও সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দিন বলে মনে করা হয়।

   

স্কুলে ভরতি থেকে চাকরি, বার্থ সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করল NDA সরকার

ইতিহাস বলছে, ১৪শ শতক থেকেই জনবিল মেলা অসমের আদিবাসী সংস্কৃতির এক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। আজও সেই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ। মেলার মাঠে এদিন তিওয়া জনগোষ্ঠীর মানুষজন আশপাশের পাহাড়ি এলাকা থেকে নেমে আসেন নিজেদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে কচু, হলুদ, আদা, লঙ্কা, ধনে-সহ নানা ধরনের কৃষিপণ্য।

এই সব সামগ্রী তাঁরা বিনিময় করেন সমতলের মানুষের সঙ্গে। বিনিময়ে পান পিঠে, বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খাবার, জলখাবার ও খার কিন্তু কোথাও এক টাকাও লেনদেন হয় না। এখানে মুদ্রা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। লেনদেন চলে শুধুই পারস্পরিক বোঝাপড়া ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে।

এই বার্টার প্রথাই জনবিল মেলার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে এই বিনিময় কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং এটি এক ধরনের সামাজিক বন্ধনের প্রতীক। আধুনিক অর্থনীতির যুগেও এই প্রথা দেখিয়ে দেয় সমাজ টিকে থাকতে গেলে বিশ্বাস ও সহাবস্থানের মূল্য কতটা গভীর। এই দিনটিতে পাহাড় ও সমতলের মানুষ একে অপরের সঙ্গে মিশে যান। কেউ ক্রেতা, কেউ বিক্রেতা এই বিভাজন এখানে নেই। সবাই অংশগ্রহণকারী, সবাই অংশীদার।

বার্টার বিনিময়ের পাশাপাশি মেলায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে একাধিক ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান। রাজ দরবার, যেখানে গোভা দেওরাজা প্রথাগত সভা করেন, এবং মাছ ধরা উৎসব সব মিলিয়ে জনবিল মেলা যেন অসমের লোকসংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রদর্শনী।

উপস্থিত বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি ও সমাজনেতারা এই বার্টার প্রথাকে পাহাড় ও সমতলের মানুষের মধ্যে ঐক্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের জীবন্ত নিদর্শন বলে উল্লেখ করেন। তাঁদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সমাজেও এই প্রথার প্রাসঙ্গিকতা আজও অটুট।

‘জনবিল’ নামটির পিছনেও রয়েছে একাধিক লোককথা। অসমীয়া ভাষায় ‘জন’ অর্থ চাঁদ, আর ‘বিল’ অর্থ জলাভূমি। একটি জনপ্রিয় কাহিনি অনুযায়ী, এক যুদ্ধের পর গোভা রাজা একটি অর্ধচন্দ্রাকৃতির জলাভূমি দেখতে পান। সেই জায়গাতেই তিনি একটি ভোজের আয়োজন করেন। বর্তমান গোভা রাজা ডিপসিং দেওরাজা জানান, “যুদ্ধের পর রাজা ওই চাঁদের মতো দেখতে বিলের ধারে ভোজের আয়োজন করেছিলেন। পরের বছর থেকেই সেই স্থানেই শুরু হয় জনবিল মেলা।”

জনবিল মেলা আজ শুধু একটি মেলা নয় এটি অসমের আদিবাসী পরিচয়, সামাজিক ঐক্য এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত স্মারক। যেখানে টাকা নয়, মানুষই আসল সম্পদ। যুগ বদলালেও, জনবিল মেলা প্রমাণ করে দেয় কিছু ঐতিহ্য সময়ের স্রোতে হারায় না, বরং আরও শক্ত হয়ে টিকে থাকে।

Advertisements