চিন সীমান্তে ১৬ হাজার ফুট উঁচুতে সড়ক! মুলিং লায় নয়া কৌশল ভারতের

muling la strategic road project

উত্তরাখণ্ডের দুর্গম হিমালয়ে ভারতের সীমান্ত প্রতিরক্ষা পরিকাঠামোকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে চলেছে মোদী সরকারের আর এক উচ্চাভিলাষী উদ্যোগ। ভারত–তিব্বত সীমান্তের একেবারে প্রান্তে, নীলাপানি থেকে মুলিং লা পর্যন্ত প্রায় ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি উচ্চ-উচ্চতার কৌশলগত সড়ক নির্মাণের কাজ এগোচ্ছে। প্রকল্পটির দায়িত্বে রয়েছে বর্ডার রোডস অর্গানাইজেশন (বিআরও)।

Advertisements

এই সড়কটি কার্যত এক সময়ের আদিম মাটির পথ ও দুর্গম ট্রেকিং রুটকে রূপান্তরিত করবে সর্বকালীন, সামরিকভাবে কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থায়। সূত্রের দাবি, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের জন্য ইতিমধ্যেই পরামর্শদাতা নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিআরও, যা স্পষ্ট করে দিচ্ছে, প্রকল্পটি কেবল নীতিগত আলোচনায় আটকে নেই, বাস্তব রূপ নেওয়ার পথে।

   

প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ১০৪ কোটি টাকা। গিরিপথ মুলিং লা অবস্থিত প্রায় ১৬,১৩৪ ফুট উচ্চতায়—একটি মৌসুমি উচ্চ-পাহাড়ি পথ, যা উত্তরাখণ্ড সেক্টরকে সরাসরি চিনের তিব্বত স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করে। আধুনিক সীমারেখা কঠোর হওয়ার বহু আগেই এই পথ ছিল ট্রান্স-হিমালয়ান চলাচলের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর—ব্যবসায়ী, পশুপালক ও সীমান্ত পাহারাদারদের পরিচিত যাত্রাপথ।

১৯৬২ সালের ভারত–চিন যুদ্ধের পর কয়েক দশক ধরে এই অঞ্চল কার্যত যোগাযোগ বিচ্ছিন্নই ছিল। একদিকে নির্মম ভূপ্রকৃতি, অন্যদিকে সীমান্তের কাছে সড়ক নির্মাণে অনীহার পুরনো প্রতিরক্ষা দর্শন—এই দুই মিলিয়ে এলএসি সংলগ্ন এলাকায় পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সেই দৃষ্টিভঙ্গির মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে।

বর্তমানে মুলিং লা বেসে পৌঁছতে সেনা ও সরঞ্জামের প্রায় পাঁচ দিনের পায়ে হাঁটা পথ অতিক্রম করতে হয়। রসদ, জ্বালানি ও যুদ্ধসামগ্রী পৌঁছয় বাহক কিংবা প্যাক অ্যানিমালের মাধ্যমে। শীতকালে ভারী তুষারপাতে এই পথ প্রায় সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে, ফলে আগাম মজুত ও ব্যয়বহুল বিমানযোগে সরবরাহের উপর নির্ভর করতেই হয়।

নীলাপানি–মুলিং লা সড়ক চালু হলে এই বাস্তবতা আমূল বদলে যাবে। সেনা মোতায়েন ও শক্তিবৃদ্ধির সময় দিন থেকে নেমে আসবে ঘণ্টায়। চরম আবহাওয়ার মধ্যেও যানবাহন চলাচল সম্ভব হবে, বজায় থাকবে সামনের সারিতে নিরবচ্ছিন্ন উপস্থিতি। একই সঙ্গে আকাশপথে রসদ পাঠানোর উপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে।

এই উদ্যোগ ২০২০ সালের পূর্ব লাদাখে ভারত–চিন সংঘাতের পর সীমান্ত পরিকাঠামো জোরদারের যে ত্বরান্বিত নীতি নেওয়া হয়েছে, তারই সম্প্রসারণ। তিব্বত জুড়ে চিনের বিস্তৃত সড়ক ও রেল নেটওয়ার্ক—এলএসি পর্যন্ত ফিডার রোডসহ—ভারতের দীর্ঘদিনের পরিকাঠামোগত ঘাটতিকে স্পষ্ট করেছিল। সেই তুলনায় উত্তরাখণ্ড, সংবেদনশীল সীমান্ত রাজ্য হওয়া সত্ত্বেও, শেষ মাইল সামরিক সংযোগে পিছিয়ে ছিল। নীলাপানি–মুলিং লা প্রকল্প সেই ফাঁক পূরণেরই প্রতীক।

প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকারীদের মতে, উন্নত সীমান্ত যোগাযোগ উত্তেজনা বাড়ায় না; বরং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও স্পষ্ট কৌশলগত বার্তা দেওয়ার মাধ্যমে স্থিতাবস্থা বজায় রাখতে সাহায্য করে।

নির্মাণ চ্যালেঞ্জও কম নয়। হিমালয়ের অন্যতম কঠিন পরিবেশে এই রাস্তা তৈরি করতে হবে। যে পরামর্শদাতা পরিষেবা চাওয়া হয়েছে, তাতে ভূপ্রকৃতি বিশ্লেষণ, তুষারধস প্রতিরোধ, ঢাল স্থিতিশীলকরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী নির্মাণ পদ্ধতির উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এটি কোনও সাময়িক পথ নয়, বরং বহু বছরের জন্য পরিকল্পিত একটি স্থায়ী কৌশলগত সম্পদ।

সব মিলিয়ে, নীলাপানি–মুলিং লা সড়ক নিছক একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়। এটি ভারতের নতুন হিমালয়ান প্রতিরক্ষা দর্শনেরই অংশ—যেখানে রাস্তা, সুড়ঙ্গ, সেতু ও বিমানঘাঁটি একসঙ্গে জাতীয় নিরাপত্তার কৌশলগত ভিত্তি হয়ে উঠছে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements