নয়াদিল্লি: দেশজুড়ে রেল দুর্ঘটনা নিয়ে বাড়তে থাকা (Modi Government)উদ্বেগের মধ্যেই রেল নিরাপত্তায় সবচেয়ে বড় আর্থিক উদ্যোগের পথে হাঁটতে চলেছে মোদি সরকার। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রেল নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রায় ₹১.৩ ট্রিলিয়ন (১.৩ লক্ষ কোটি টাকা) বরাদ্দ করার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ বেশি। রেল মন্ত্রকের একাধিক সূত্রের দাবি, বহুদিন ধরেই ঝুলে থাকা নিরাপত্তা সংস্কারে এবার বাস্তবিক অর্থেই গতি আসতে চলেছে।
এই বিপুল বরাদ্দ মূলত তিনটি খাতে ব্যয় করা হবে রেল লাইনের সংস্কার ও নবীকরণ, রোলিং স্টক অর্থাৎ লোকোমোটিভ ও কোচের রক্ষণাবেক্ষণ এবং দ্রুতগতিতে সম্প্রসারণ করা হবে কবচ (KAVACH), ভারতের নিজস্ব ট্রেন সুরক্ষা ব্যবস্থা। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে একের পর এক রেল দুর্ঘটনা সামনে আসার পরেই কেন্দ্রীয় সরকার এই বড় সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জৈশ জঙ্গিদের খোঁজে কিস্তোয়ারে শুরু হয়েছে সেনা অপারেশন
রেল মন্ত্রকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবর্ষে মোট ৩১টি রেল দুর্ঘটনা ঘটেছে। চলতি অর্থবর্ষ শুরু হওয়ার পর এখনও পর্যন্ত ১০টি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ দুর্ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এই পরিসংখ্যানই রেল নিরাপত্তার বর্তমান চিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। বিশেষ করে ঘন জনবসতিপূর্ণ রুট এবং পুরনো রেল লাইনে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছিলেন রেল কর্মী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরা।
এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে কবচ (KAVACH) ব্যবস্থা। এটি ভারতীয় রেল ও ডিআরডিও-র যৌথ উদ্যোগে তৈরি একটি স্বয়ংক্রিয় ট্রেন সুরক্ষা প্রযুক্তি, যা চালকের ভুল বা সিগন্যাল অমান্য করার ক্ষেত্রে ট্রেনকে নিজে থেকেই থামাতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এতদিনে কবচ ব্যবস্থার আওতায় এসেছে মাত্র ১,৪৬৫ কিলোমিটার রেলপথ, যা দেশের মোট ৬৭,০০০ কিলোমিটার নেটওয়ার্কের মাত্র ২ শতাংশের সামান্য বেশি।
রেল সূত্রে জানা গেছে, নতুন বরাদ্দের বড় অংশ কবচের দ্রুত সম্প্রসারণে ব্যয় করা হবে। আগামী কয়েক বছরে ব্যস্ত রুট, উচ্চগতির করিডর এবং দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে এই সুরক্ষা ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। রেল আধিকারিকদের একাংশের মতে, “যদি কবচ পুরোপুরি কার্যকর করা যায়, তাহলে বহু দুর্ঘটনাই এড়ানো সম্ভব।”
শুধু প্রযুক্তিই নয়, রেল লাইনের শারীরিক অবস্থা উন্নত করাও এই প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য। বহু জায়গায় এখনও পুরনো লাইন, ক্ষয়প্রাপ্ত স্লিপার এবং সিগন্যালিং ব্যবস্থার দুর্বলতা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। তাই ট্র্যাক রিনিউয়াল এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্যও বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হচ্ছে।
রোলিং স্টকের ক্ষেত্রেও একই ছবি। অনেক ট্রেন ও লোকোমোটিভ দীর্ঘদিন ধরে পরিষেবায় রয়েছে, যার ফলে যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কা বাড়ছে। নতুন পরিকল্পনায় কোচ ও ইঞ্জিনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আগাম ত্রুটি শনাক্ত করার ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
রেল নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বরাদ্দ যদি সঠিকভাবে ও সময়মতো কাজে লাগানো যায়, তাহলে এটি ভারতীয় রেলের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে ছোটখাটো সংস্কারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা নিরাপত্তা উদ্যোগ অবশেষে বড় পরিসরে বাস্তবায়িত হতে চলেছে।
সব মিলিয়ে, ₹১.৩ ট্রিলিয়নের এই নিরাপত্তা প্যাকেজ শুধু আর্থিক বরাদ্দ নয়, বরং রেল যাত্রীদের আস্থা ফেরানোর একটি বড় প্রচেষ্টা বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। এখন দেখার, এই পরিকল্পনা বাস্তবে কত দ্রুত ও কতটা কার্যকরভাবে রূপ পায়।
