
মঙ্গল গ্রহে কর্মরত সমস্ত রোভার, অরবিটার ও ল্যান্ডার আগামী কয়েক সপ্তাহের জন্য রেডিও নীরবতায় চলে যেতে চলেছে। এই সময়ে পৃথিবীর সঙ্গে মঙ্গল গ্রহের (Nasa) কোনও সরাসরি যোগাযোগ থাকবে না। ফলে নাসাসহ বিশ্বের বিভিন্ন মহাকাশ সংস্থার জন্য এটি একটি পরিকল্পিত কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়।
এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মূল কারণ হল একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা, যার নাম সোলার কনজাঙ্কশন। প্রতি দুই পৃথিবী বছর অন্তর এই ঘটনা ঘটে, যখন সূর্য পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের ঠিক মাঝখানে অবস্থান করে। এর ফলে পৃথিবী থেকে মঙ্গল গ্রহের দিকে সরাসরি দৃষ্টিসংযোগ বাধাপ্রাপ্ত হয়। এই অবস্থায় মঙ্গল গ্রহে থাকা মহাকাশযানগুলি যখন পৃথিবীর দিকে রেডিও সিগন্যাল পাঠায়, তখন সূর্য থেকে নির্গত বিপুল পরিমাণ চার্জযুক্ত কণা সেই সিগন্যালের সঙ্গে হস্তক্ষেপ করে।
এই চার্জযুক্ত কণাগুলি রেডিও তরঙ্গকে বিকৃত করে দেয়, যার ফলে পৃথিবীতে পৌঁছনো তথ্য অসম্পূর্ণ বা ভুল হতে পারে। এর ফলে বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদানে বড়সড় ফাঁক তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, পৃথিবী থেকে যদি এই সময়ে মঙ্গল গ্রহের মহাকাশযানগুলিকে কোনও নির্দেশ পাঠানো হয়, তাহলে সেই নির্দেশও বিকৃত হয়ে যেতে পারে। বিকৃত বা ভুল নির্দেশ মহাকাশযানের জন্য মারাত্মক বিপদের কারণ হতে পারে—এমনকি পুরো মিশনও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই ঝুঁকি এড়ানোর জন্যই মহাকাশ সংস্থাগুলি আগেভাগেই সতর্ক ব্যবস্থা নেয়। সোলার কনজাঙ্কশনের সময় কোনও নতুন নির্দেশ পাঠানো হয় না। তার বদলে, মঙ্গল গ্রহে থাকা রোভার ও ল্যান্ডারগুলিকে আগে থেকেই কিছু নির্দিষ্ট কাজের তালিকা বা প্রি-প্রোগ্রামড নির্দেশনা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই নির্দেশনাগুলির মধ্যে থাকে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থার নজরদারি, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী নিজেকে সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা।
এই সময়ে রোভারগুলো সাধারণত খুব সীমিত কার্যকলাপে থাকে। তারা নতুন কোনও পরীক্ষা বা জটিল বৈজ্ঞানিক কাজ করে না। বরং নিজেদের সিস্টেম ঠিকঠাক চলছে কি না, ব্যাটারি কতটা চার্জ আছে, যন্ত্রাংশে কোনও সমস্যা হচ্ছে কি না—এসব বিষয়ের উপরই নজর দেয়। বিজ্ঞানীরা একে বলেন “সেফ মোড”-এর কাছাকাছি একটি অবস্থা।
যদিও এই সময়ে পৃথিবী থেকে সরাসরি যোগাযোগ সম্ভব হয় না, তবুও মঙ্গল গ্রহে থাকা যন্ত্রগুলো পুরোপুরি অচল হয়ে যায় না। তারা নিজেদের মতো করে কাজ চালিয়ে যায় এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করে রাখে। সোলার কনজাঙ্কশন শেষ হলে আবার ধীরে ধীরে পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন হয় এবং জমে থাকা তথ্য একে একে পাঠানো হয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, সোলার কনজাঙ্কশন কোনও অস্বাভাবিক বা বিপজ্জনক ঘটনা নয়। বরং এটি একটি স্বাভাবিক মহাজাগতিক প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রতিটি মঙ্গল মিশন আগে থেকেই প্রস্তুত থাকে। নাসা ও অন্যান্য মহাকাশ সংস্থার ইঞ্জিনিয়াররা বহু বছর ধরে এই ধরনের পরিস্থিতি সামলানোর অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন।










