
মুম্বই: মহারাষ্ট্রে নকশালবিরোধী লড়াই আরও এক ধাপ এগোল (Maoists surrender in Maharashtra)। রাজ্যের ডিরেক্টর জেনারেল অফ পুলিশ (DGP) রশ্মি শুকলার সামনে আত্মসমর্পণ করল আরও ১১ জন মাওবাদী, যাঁদের মাথার দাম মিলিয়ে মোট ৮২ লক্ষ টাকা। দীর্ঘদিন ধরে গাডচিরোলি, গোঁদিয়া ও চন্দ্রপুরের ঘন জঙ্গলে কার্যক্রম চালানো এই মাওবাদীরা অবশেষে ফিরে আসার পথ বেছে নিলেন। পুলিশের ভাষায়, এটি শুধু একটি সাফল্য নয়—এটি শান্তির পথে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
DGP রশ্মি শুকলা সাংবাদিকদের জানান, আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বড় মাপের সদস্য রয়েছেন, যাঁরা বহু হামলা, বিস্ফোরণ, পুলিশের ওপর আক্রমণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের উপর দমনপীড়নে যুক্ত ছিলেন। এদের মধ্যে কয়েকজন ছিল ডিভিশনাল কমিটি লেভেলে, যাঁরা মাওবাদী সংগঠনের অপারেশনাল স্ট্রাটেজি পরিচালনা করতেন। আত্মসমর্পণের পরে তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য রাজ্য সরকারের বিশেষ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
নাগপুরে অতর্কিতে চিতার আক্রমণে আহত ৭
মহারাষ্ট্রে মাওবাদী দমনের ইতিহাস গত দশকে নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে। একসময় এই অঞ্চলে নকশালপন্থী হামলায় প্রতি বছর গড়ে ১০ জন করে পুলিশ কর্মী মারা যেত—২০১4 পর্যন্ত এই ছিল কঠোর বাস্তব। কিন্তু ২০১৪-এর পর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে। রাজ্যের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনভিস দায়িত্ব নেওয়ার পরে ২০১৫ সালে প্রথমবার দেখা যায়—সারা বছরে একজন পুলিশ সদস্যও নকশালী হামলায় নিহত হননি। প্রশাসনের দাবি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত গোয়েন্দা তথ্য, স্থানীয় আদিবাসীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থা এই পরিবর্তনের নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
শুধু নিরাপত্তা নয়, উন্নয়নেও বড় পদক্ষেপ ছিল এ সময়ে। বহু বছর অনুন্নয়ন ও বঞ্চনার কারণে নকশাল প্রভাবিত অঞ্চলগুলো সরকারের ওপর আস্থা হারিয়েছিল। সেই বাস্তব বদলাতে শুরু হয় যখন রাজ্য সরকার বড় শিল্প বিনিয়োগ টেনে আনে। বিশেষ করে উল্লেখযোগ্য, JSW-র ১ লক্ষ কোটি টাকার স্টিল প্ল্যান্ট, যেটি স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেয় এবং শিল্পায়নের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়নই শেষ পর্যন্ত নকশালবাদের ভিত্তি দুর্বল করতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, আত্মসমর্পণকারী ১১ জনের মধ্যে অনেকেই বয়সে কম। কেউ কেউ আদিবাসী সম্প্রদায় থেকে উঠে এসেছে, যাদের মাওবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে ভুল পথে প্রলুব্ধ করেছিল। বন-জঙ্গল ঘেরা গ্রাম থেকে উঠে আসা এই তরুণদের অনেকেই এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান। ভয়ের মধ্যে দিন কাটানো, লাগাতার পালিয়ে বেড়ানো, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এই অভিজ্ঞতা তাদের ক্লান্ত করে তুলেছে।
DGP রশ্মি শুকলা জানান, “রাজ্য সরকার ও পুলিশের ওপর মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পেয়েছে। যারা জীবন নিয়ে আতঙ্কে ছিল, তারা আজ বুঝছে যে মূলধারায় ফিরে আসাই ভালো। আমরা প্রত্যেক আত্মসমর্পণকারীর জন্য পুনর্বাসন, শিক্ষা, রোজগার এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা করছি।” তিনি আরও বলেন, “মাওবাদীদের শক্তি ভেঙে পড়ছে। নিরাপত্তা বাহিনী যেভাবে সমন্বিতভাবে কাজ করছে, তাতে ভবিষ্যতে আরও অনেকেই আত্মসমর্পণের পথে হাঁটবেন বলে আমরা আশা করছি।”
এই আত্মসমর্পণ ঘটনাটি আবারও মনে করিয়ে দিল মহারাষ্ট্রে উগ্রপন্থার অধ্যায় দ্রুতই শেষের পথে। পাহাড়, জঙ্গল আর কাঠের ঘরঘেরা দূরবর্তী গ্রামগুলোতে ধীরে ধীরে শান্তির আলো ফিরছে। সরকার ও প্রশাসনের আশা, একদিন রাজ্যের এই নকশাল-প্রভাবিত অঞ্চলগুলোও উন্নয়নের মূল স্রোতে এসে মিলবে সম্পূর্ণভাবে।










