
বড়দিনের ঠিক আগের সকালে ভারতের মহাকাশ অভিযানে যোগ হল আরেকটি স্বর্ণাক্ষরিত অধ্যায়। মঙ্গলবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২৫—সকাল ঠিক ৮টা ৫৪ মিনিটে শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্রের দ্বিতীয় উৎক্ষেপণ মঞ্চ থেকে গর্জে উঠল LVM3-M6। ৬৪০ টন ওজনের এই বিশাল রকেট—নাম দেওয়া হয়েছে ‘বাহুবলী’—ভারতীয় মাটি থেকে উৎক্ষেপিত সবচেয়ে ভারী বিদেশি উপগ্রহকে সফলভাবে পৌঁছে দিল নিম্ন কক্ষপথে।
এই মিশনের পে-লোড ছিল মার্কিন সংস্থা AST SpaceMobile-এর BlueBird Block-2—৬.৫ টন ওজনের এক সুবিশাল যোগাযোগ উপগ্রহ। এটি শুধু LVM3-এর ষষ্ঠ সফল অপারেশনাল উড়ানই নয়, একই সঙ্গে ইসরোর ১০১তম অরবিটাল সাফল্য এবং নিউস্পেস ইন্ডিয়া লিমিটেড (NSIL)-এর হাত ধরে এক বড়সড় বাণিজ্যিক জয়।
নিখুঁত উৎক্ষেপণ, বিশ্বমানের নির্ভুলতা
লাইভ সম্প্রচারে লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ করেন তিন ধাপের এই দৈত্যাকার রকেটের নিখুঁত পারফরম্যান্স—দুটি S200 সলিড বুস্টার, L110 লিকুইড কোর ও C25 ক্রায়োজেনিক আপার স্টেজ একের পর এক নির্ভুলভাবে কাজ করে BlueBird Block-2-কে ৫২০–৬০০ কিমি উচ্চতার লো আর্থ অরবিটে স্থাপন করে।
উৎক্ষেপণের পর ইসরো প্রধান বলেন, “ভারতীয় মাটি থেকে সবচেয়ে ভারী উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে আমরা নতুন মাইলফলক ছুঁয়েছি। LVM3 আবারও প্রমাণ করল তার বিশ্বমানের নির্ভরযোগ্যতা—২ কিমি-রও কম অরবিটাল ডিসপারশন আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রমী।”
মোবাইল টাওয়ার ছাড়াই 4G/5G: সংযোগ বিপ্লবের দোরগোড়ায়
BlueBird Block-2 শুধু আকারে নয়, প্রযুক্তিতেও যুগান্তকারী। ২২৩ বর্গমিটার ফেজড-অ্যারে অ্যান্টেনা-সহ এই উপগ্রহ সরাসরি সাধারণ স্মার্টফোনে 4G/5G সিগন্যাল পাঠাতে সক্ষম—কোনও পরিবর্তন ছাড়াই।
হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চল, মহাসাগরের মাঝখান, কিংবা মরুভূমির বিস্তীর্ণ এলাকা—যেখানে টাওয়ার পৌঁছয় না, সেখানেই পৌঁছবে সংযোগ। ৫০টিরও বেশি আন্তর্জাতিক মোবাইল অপারেটরের সঙ্গে অংশীদারিত্বে AST SpaceMobile এই প্রযুক্তিকে ডিজিটাল বিভাজন ঘোচানোর অন্যতম হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। স্টারলিঙ্কের মতো প্রকল্পের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ‘ডাইরেক্ট-টু-সেল’ ব্রডব্যান্ডে নতুন সমীকরণ তৈরি করছে এই নেটওয়ার্ক।
ভারতের বাণিজ্যিক মহাকাশ শক্তির জোরালো বার্তা
২০২৫ সালে চন্দ্রযান-৩ এবং একাধিক OneWeb উৎক্ষেপণের পর বছরের শেষে এসে এই সাফল্য ভারতের মহাকাশ সক্ষমতার ধারাবাহিকতা আরও মজবুত করল। এটি LVM3-এর তৃতীয় সম্পূর্ণ বাণিজ্যিক মিশন—যা আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের উৎক্ষেপণ নির্ভরযোগ্যতার প্রমাণ।
৪৩.৫ মিটার লম্বা এই হেভি-লিফ্ট রকেট এবার তাকিয়ে মানববাহী গগনযান অভিযানের দিকে। একই সঙ্গে NSIL-এর মাধ্যমে ভারতের বাণিজ্যিক মহাকাশ বাজারে অবস্থান আরও শক্ত হচ্ছে—আত্মনির্ভর ভারতের প্রযুক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
শ্রীহরিকোটার দর্শক গ্যালারিতে তখন উল্লাস, আকাশে আলোর রেখা কেটে এগিয়ে যাচ্ছে ‘বাহুবলী’। আর কক্ষপথে BlueBird যখন তার বিশাল অ্যান্টেনা মেলতে প্রস্তুত, তখন বিশ্ব জুড়ে ডিজিটাল সংযোগের নতুন যুগের সূচনা—যার নেপথ্যে ভারতের বড়দিনের মহাকাশ-আতশবাজি।










