ভারতের পরিকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে এক উল্লেখযোগ্য (India second largest road network)মাইলফলক ছুঁয়েছে সড়কপথের নেটওয়ার্ক। সরকারি তথ্য ও ইন্ডিয়া ব্র্যান্ড ইক্যুইটি ফাউন্ডেশন (IBEF) এবং প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো (PIB)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ ভারতের মোট সড়ক নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬৩.৭ লক্ষ কিলোমিটার।
এর ফলে চিনকে পিছনে ফেলে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম সড়ক নেটওয়ার্কের দেশ হিসেবে উঠে এসেছে ভারত। তালিকায় প্রথম স্থানে রয়েছে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে মোট সড়কপথের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৮ লক্ষ কিলোমিটার।
‘প্রোটেকশন না থাকলেও লড়াই চলবে’, বললেন মুরুগান
এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী চিনের মোট সড়ক নেটওয়ার্ক বর্তমানে প্রায় ৫৩ লক্ষ কিলোমিটার, যা ভারতের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে গত এক দশকে অবকাঠামো উন্নয়নের যে জোরালো প্রচেষ্টা কেন্দ্র সরকার চালিয়েছে, তার বড় সাফল্য হিসেবেই এই অগ্রগতি তুলে ধরা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা যাচ্ছে, ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের সড়ক নেটওয়ার্কে প্রায় ৩৫ শতাংশ বৃদ্ধি ঘটেছে। বিশেষ করে জাতীয় সড়ক নির্মাণে ব্যাপক গতি এসেছে। ‘ভারতমালা পরিযোজনা’-সহ একাধিক প্রকল্পের আওতায় গত এক দশকে ৫৫ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি নতুন জাতীয় সড়ক যুক্ত হয়েছে। মালবাহী করিডর, এক্সপ্রেসওয়ে, চার ও ছয় লেনের হাইওয়ে, বাইপাস ও ফ্লাইওভার নির্মাণের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, উন্নত সড়ক নেটওয়ার্কের ফলে পণ্য পরিবহণের সময় ও খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। গ্রামীণ এলাকা থেকে শহর, বন্দর ও শিল্পাঞ্চলের সংযোগ উন্নত হওয়ায় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি এসেছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য পরিবহণ, ই-কমার্স, পর্যটন এবং লজিস্টিক সেক্টর এই উন্নয়নের সরাসরি সুফল পাচ্ছে। কেন্দ্রের মতে, শক্তিশালী সড়ক পরিকাঠামো “৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি” গঠনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন ছবিতে ও সরকারি প্রচারসামগ্রীতে দেখা যাচ্ছে আধুনিক বহু-লেনের হাইওয়ে, জটমুক্ত ইন্টারচেঞ্জ, উঁচু ফ্লাইওভার এবং উন্নত টোল প্লাজা। এগুলিকে ভারতের অবকাঠামোগত রূপান্তরের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। দিল্লি-মুম্বই এক্সপ্রেসওয়ে, পূর্বাঞ্চলীয় ও পশ্চিমাঞ্চলীয় ডেডিকেটেড ফ্রেইট করিডর সংযোগ সড়ক, এবং বিভিন্ন রাজ্যের গ্রিনফিল্ড এক্সপ্রেসওয়ে এই অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
তবে এই সাফল্যের পাশাপাশি সমালোচনাও কম নয়। বিশেষজ্ঞদের একাংশের দাবি, সড়কের দৈর্ঘ্য গণনার ক্ষেত্রে সরকার “লেন-কিলোমিটার” বা প্রশস্ত লেনকে আলাদা করে ধরছে, ফলে প্রকৃত কেন্দ্ররেখা অনুযায়ী হিসাব করলে পরিসংখ্যান কিছুটা ফুলিয়ে দেখানো হতে পারে। অর্থাৎ একটি চার লেনের রাস্তা কখনও কখনও চার গুণ হিসাব করা হচ্ছে—এই অভিযোগ তুলছেন সমালোচকরা।
এছাড়াও সামাজিক মাধ্যমে বহু ব্যবহারকারী উন্নত রাস্তার ছবির পাশাপাশি বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। তাঁদের অভিযোগ, বহু জায়গায় নতুন রাস্তা তৈরি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই গর্ত, ফাটল ও ভাঙনের সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বর্ষার সময় জল জমে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শুধুমাত্র রাস্তার দৈর্ঘ্য বাড়ানো নয়, রক্ষণাবেক্ষণ ও নির্মাণমান উন্নত করাও সমান জরুরি বলে মত বিশেষজ্ঞদের।
পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি সাফল্যের জন্য তিনটি বিষয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন—উন্নত মানের নির্মাণ, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং স্বচ্ছ নজরদারি ব্যবস্থা। নচেৎ বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমবে না। একই সঙ্গে পরিবেশগত দিক ও ভূমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত সমস্যার দিকেও নজর দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, সড়কপথের নেটওয়ার্কে চিনকে পিছনে ফেলে বিশ্বে দ্বিতীয় স্থানে উঠে আসা ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে একটি বড় সাফল্য ও গর্বের মুহূর্ত। তবে এই পরিসংখ্যানকে বাস্তব উন্নয়নে রূপ দিতে হলে কেবল দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির দৌড় নয়, টেকসই নির্মাণ, নিরাপত্তা এবং রক্ষণাবেক্ষণের ওপর সমান গুরুত্ব দেওয়াই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
