ভারতে-নিউজিল্যান্ড বাণিজ্য চুক্তিতে অস্বস্তিতে বিদেশমন্ত্রী

india-new-zealand-fta-dairy-dispute

নয়াদিল্লি: ভারত–নিউজিল্যান্ড মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) ঘিরে নিউজিল্যান্ড (India New Zealand FTA dairy dispute)সরকারের অন্দরে প্রকাশ্যে ফাটল দেখা দিল। দেশটির বিদেশমন্ত্রী প্রকাশ্যে এই চুক্তিকে ‘না ফ্রি, না ফেয়ার’ বলে আক্রমণ করেছেন এবং সাফ জানিয়ে দিয়েছেন এই চুক্তি সংসদে এলে তাঁর দল এর বিরোধিতা করবে। মূল ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দু একটাই চুক্তির বাইরে রাখা হয়েছে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে শক্তিশালী রফতানি খাত, দুগ্ধ শিল্প।

Advertisements

নিউজিল্যান্ডের অর্থনীতিতে দুগ্ধজাত পণ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুধ, মাখন, চিজ ও মিল্ক পাউডার রফতানিতে দেশটি বিশ্বসেরা। ভারতীয় বাজারে প্রবেশাধিকার পেলে সেটি নিউজিল্যান্ডের জন্য বিরাট লাভের সুযোগ হতে পারত। কিন্তু ভারতের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই স্পষ্ট ছিল দুগ্ধ খাত আলোচনার বাইরে থাকবে। সেই অবস্থানেই অনড় থেকেছে নয়াদিল্লি।

   

বিদেশমন্ত্রীর অভিযোগ, ভারতকে যে ছাড় দেওয়া হয়েছে, তা ‘অসামঞ্জস্যপূর্ণ’। তাঁর দাবি, শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে নিউজিল্যান্ড ভারতকে মাথাপিছু হিসেবে অস্ট্রেলিয়া বা যুক্তরাজ্যের থেকেও বেশি সুযোগ দিতে রাজি হয়েছিল। তবুও ভারতের তরফে দুগ্ধ খাতে একচুলও ছাড় দেওয়া হয়নি। তাঁর বক্তব্য, “এটা কোনওভাবেই সমান ও ন্যায্য চুক্তি নয়।”

এই মন্তব্যে নিউজিল্যান্ড সরকারের ভেতরের মতপার্থক্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে। কারণ প্রধানমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রকের একাংশ এই চুক্তিকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে দেখছে বিশেষ করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর প্রেক্ষিতে। কিন্তু দুগ্ধ শিল্পের স্বার্থে আঘাত লাগায় রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

অন্যদিকে, নয়াদিল্লিতে এই পরিস্থিতিকে দেখা হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চোখে। ভারতীয় বাণিজ্য মহলের মতে, দুগ্ধ খাতকে চুক্তির বাইরে রাখা ভারতের বড় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সাফল্য। ভারতে কোটি কোটি ছোট ও প্রান্তিক দুগ্ধচাষির জীবিকা এই খাতের সঙ্গে জড়িত। বিদেশি দুগ্ধ পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশ ঘটলে দেশীয় বাজারে বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এই আশঙ্কা থেকেই ভারতের অবস্থান ছিল কঠোর।

বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়ালের নেতৃত্বাধীন ভারতের আলোচক দল এই প্রশ্নে একচুলও নড়েনি। সূত্রের খবর, আলোচনা টেবিলে বারবার চাপ এলেও ভারত স্পষ্ট করে জানিয়ে দেয় দুগ্ধ খাত ভারতের জন্য ‘নন-নেগোশিয়েবল’। শেষ পর্যন্ত সেই অবস্থান মেনেই চুক্তির কাঠামো এগিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতের সাম্প্রতিক বাণিজ্য কূটনীতির ধারাবাহিকতা। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য সব ক্ষেত্রেই ভারত কৃষি ও দুগ্ধ খাতে সংবেদনশীলতা বজায় রেখেছে। নিউজিল্যান্ডের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং ভারতের পক্ষ থেকে পরিষ্কার বার্তা দেওয়া হয়েছে বাজার খোলার বিনিময়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতি ঝুঁকির মুখে ফেলা হবে না।

নিউজিল্যান্ডে যদিও এই অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক আরও বাড়তে পারে। সংসদে চুক্তি পেশ হলে বিরোধিতা হলে তা সরকারের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। তবে কূটনৈতিক স্তরে আলোচনা যে পুরোপুরি থেমে যাচ্ছে, এমন ইঙ্গিত এখনও নেই।

সব মিলিয়ে, ভারত–নিউজিল্যান্ড এফটিএ ঘিরে যে শব্দচাপ তৈরি হয়েছে, তার আড়ালে এক বাস্তব সত্য স্পষ্ট দুগ্ধ খাতকে বাইরে রাখার মাধ্যমে ভারত নিজের লাল রেখা টেনেছে এবং সেই রেখা মানতে বাধ্য হয়েছে ওয়েলিংটন। কূটনৈতিক দরকষাকষিতে এটিই আপাতত ভারতের বড় জয় বলেই মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements