
কলকাতা: ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ককে এতদিন “বন্ধুত্বপূর্ণ” ও “বিশেষ কৌশলগত অংশীদারিত্ব” (India–Bangladesh)হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রের দিকে তাকালে প্রশ্ন উঠছেই ভারত আসলে ঠিক কী করছে? কারণ তথ্য-পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের অর্থনীতি, শক্তি নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক কাঠামোর বহু স্তম্ভেই ভারতের ভূমিকা নির্ণায়ক। তবু সেই বিপুল কৌশলগত লিভারেজ কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না বলেই মত বিশিষ্ট লেখক রাহুল শিবশংকরের।
রাহুল তার এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে লিখেছেন, বাংলাদেশের রফতানি নির্ভর অর্থনীতির মেরুদণ্ড হল তৈরি পোশাক শিল্প। আর সেই শিল্পের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল কটন বা তুলো আসছে ভারতের বাজার থেকেই। ভারতের তুলো সরবরাহ ব্যাহত হলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস সেক্টর কার্যত থমকে যেতে পারে। তবু এই বাস্তবতা কখনও কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে আসেনি।
৫ জানুয়ারি সাগরে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী, ভিআইপি সংস্কৃতি রোধে সরেজমিন তদারকি
লেখকের মতে শক্তি ক্ষেত্রেও ভারতের ভূমিকা আরও স্পষ্ট। ভারত থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ হয়, ভারতীয় সংস্থাগুলি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে, ডিজেল পাইপলাইন চালু হয়েছে। অর্থাৎ, শুধু বাণিজ্য নয় বাংলাদেশের ‘লাইট অন’ রাখার ক্ষেত্রেও ভারতের অবদান গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্ন উঠছে, এত গভীর নির্ভরতার পরও কেন ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিচ্ছে না?
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দিক নির্দেশ করে তিনি বলেছেন, খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়েও ভারতের উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশ। চাল, গম, চিনি সহ একাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে বাংলাদেশ নির্ভর করে ভারতের ওপর। দুর্ভিক্ষ বা মূল্যবৃদ্ধির সময় ভারতের রফতানি নীতিই বাংলাদেশের বাজার স্থিতিশীল রাখে। তবু সীমান্তে ভারতীয় কৃষকরা সমস্যায় পড়লে, কিংবা ভারতবিরোধী বক্তব্য উঠলে, সেই লিভারেজ কার্যত অকার্যকর থাকে।
এছাড়াও পরিকাঠামো উন্নয়নেও ভারত বড় বিনিয়োগকারী। রেল, সড়ক, বন্দর, অভ্যন্তরীণ নৌপথ লাইন অব ক্রেডিট (LoC), অনুদান ও প্রকল্পের মাধ্যমে ভারতের অর্থেই তৈরি হয়েছে বহু গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ ব্যবস্থা। এই সংযোগের সুবিধা পেয়ে বাংলাদেশ আঞ্চলিক বাণিজ্যে লাভবান হলেও, ভারত প্রায়ই রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ে পিছিয়ে থাকে বলে অভিযোগ।
আরও গভীরে গেলে দেখা যায়, বাংলাদেশের আমলাতন্ত্র, বিচারব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনীর একাংশের প্রশিক্ষণও ভারতে হয়। প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভারত সহযোগিতা করেছে বহু বছর ধরে। অর্থাৎ, ‘সফট পাওয়ার’ থেকে ‘হার্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ সব ক্ষেত্রেই ভারতের উপস্থিতি স্পষ্ট।
রাহুল শিবশংকর তার এই বিশ্লেষকের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করে প্রশ্ন তুলেছেন, এত কিছু করার পরও ভারত কেন কার্যকর কূটনৈতিক চাপ তৈরি করছে না? তার মতে, ভারতের নীতিতে অতিরিক্ত “স্ট্যাবিলিটি ফার্স্ট” দৃষ্টিভঙ্গি কাজ করছে।
দিল্লি মনে করছে, যেকোনো চাপ প্রয়োগ করলে বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে, যা আঞ্চলিক নিরাপত্তার পক্ষে ক্ষতিকর। তবে সমালোচকরা বলছেন, এই অতিরিক্ত সংযমই ভারতের দুর্বলতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ একদিকে ভারতের সুবিধা নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে বা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতবিরোধী অবস্থানও দেখা যাচ্ছে।
কূটনীতিকরা বলছেন বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায়, যেখানে চীন সক্রিয়ভাবে দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বাড়াচ্ছে, সেখানে ভারতের সামনে সুযোগ যেমন আছে, তেমনই ঝুঁকিও রয়েছে। কৌশলগত লিভারেজ থাকা সত্ত্বেও তা ব্যবহার না করলে, সেই লিভারেজের মূল্য একসময় হারিয়ে যেতে পারে। সুতরাং প্রশ্নটা আর শুধু “ভারত কী করছে?” নয় বরং “ভারত কবে তার প্রভাব বুঝে তা প্রয়োগ করবে?” এই উত্তরই আগামী দিনে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কের দিশা নির্ধারণ করবে।










