শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ? ভারতের ইতিহাসে শরণাগতের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বেনজির

নয়াদিল্লি: ভারতের মাটির একটি প্রাচীন রীতি হলো ‘শরণাগত রক্ষা’। কেউ যদি প্রাণভয়ে বা আশ্রয়ের আশায় ভারতের দ্বারে এসে দাঁড়ান, তবে নিজের জীবন দিয়েও তাকে রক্ষা…

India asylum tradition Abhaya Dana

নয়াদিল্লি: ভারতের মাটির একটি প্রাচীন রীতি হলো ‘শরণাগত রক্ষা’। কেউ যদি প্রাণভয়ে বা আশ্রয়ের আশায় ভারতের দ্বারে এসে দাঁড়ান, তবে নিজের জীবন দিয়েও তাকে রক্ষা করা এই সভ্যতার অন্যতম প্রধান সংস্কৃতি। গুজরাটের মুলি গ্রামের সাধারণ তিতির পাখি থেকে শুরু করে আধুনিককালে তিব্বতের দলাই লামা, ইতিহাসের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে এমন বীরত্বগাথা। বর্তমান প্রেক্ষাপটে যখন বাংলাদেশ থেকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি উঠছে, তখন ভারতের এই ‘অভয় দান’ বা শরণাগত রক্ষার চিরন্তন ঐতিহ্য আবারও আলোচনায়।

Advertisements

মুলি গ্রামের সেই ঐতিহাসিক আত্মত্যাগ

১৪৭৪ সালের এক লড়াই আজও গুজরাটের লোকগাঁথায় অমর হয়ে আছে। ছাবাদ উপজাতি শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে একটি আহত তিতির পাখি সোধা পারমার রাজপুতদের তাঁবুতে আশ্রয় নিয়েছিল। সামান্য একটি পাখিকে শিকারিদের হাতে তুলে না দেওয়ার জন্য রাজপুত, ব্রাহ্মণ, রাবারী এবং হরিজনরা ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করেছিলেন। সেই যুদ্ধে প্রায় ১৪০ থেকে ২০০ জন মানুষ প্রাণ দিয়েছিলেন একটি পাখির জীবন বাঁচাতে। আজও গুজরাটের মুলি গ্রামে তিতির পাখিকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। যে মাটি একটি পাখির জীবনের জন্য রক্ত ঝরাতে পারে, সেই মাটি কোনো বন্ধুকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে না, এটাই স্বাভাবিক।

   

ইতিহাসের অমোঘ শিক্ষা

ভারতীয় ইতিহাসে এমন অনেক যুদ্ধের উদাহরণ আছে যা ভূখণ্ডের জন্য নয়, বরং আশ্রিতকে রক্ষা করার জন্য লড়া হয়েছিল।

ভুচার মরি যুদ্ধ (১৫৯১): নওয়ানগরের জাম সাতাজি গুজরাট সালতানাতের শেষ রাজা মুজাফফর শাহ-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন। মুঘল সম্রাট আকবরের রোষানলে পড়ার ঝুঁকি জেনেও তিনি আশ্রিতকে ছাড়েননি। এই যুদ্ধে তিনি নিজের পরিবারের ৬০ জন সদস্যকে হারিয়েছিলেন।

হামির দেব চৌহান: রণথম্ভোরের এই বীর রাজা আলাউদ্দিন খিলজির আত্মীয় মহম্মদ শাহ-কে আশ্রয় দিয়েছিলেন। খিলজি বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও হামির দেব তার ‘হঠ’ বা প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসেননি। এর ফলে ১৩০১ সালে এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়, যেখানে হামির দেব ও তার অনুগামীরা সম্মানের সাথে মৃত্যুবরণ করেন।

পুরাণের কথা: তুলসীদাসের রামচরিতমানসে ভগবান রাম বিভীষণকে আশ্রয় দেওয়ার সপক্ষে বলেছিলেন যে, যারা আশ্রিতকে ত্যাগ করে তারা নীচ ও পাপী। এমনকি রাজা শিবী চক্রবর্তীর গল্পেও দেখা যায়, একটি ঘুঘুর প্রাণ বাঁচাতে তিনি নিজের শরীরের মাংস ঈগলকে দান করেছিলেন।

আধুনিক ভারত ও দলাই লামা

১৯৫৯ সালে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দলাই লামা যখন চিনা কমিউনিস্টদের হাত থেকে বাঁচতে ভারতে পালিয়ে আসেন, তখন জওহরলাল নেহেরু তাকে সসম্মানে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এর ফলে ১৯৬২ সালের ভারত-চীন যুদ্ধ হয়। কিন্তু আজও ভারত চিনের প্রবল চাপের মুখেও তিব্বতিদের প্রতি তার ‘অভয় দান’ ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়নি।

শেখ হাসিনা ও ভারতের নৈতিক অবস্থান

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে হত্যাকাণ্ডের সময়ও ভারত শেখ হাসিনাকে দিল্লিতে দীর্ঘ ছয় বছর সুরক্ষা দিয়েছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে তিনি আবারও ভারতে অবস্থান করছেন। যদিও বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি ও আইনি জটিলতা রয়েছে, কিন্তু ভারতের ‘সভ্যতার ডিএনএ’ বলে যে কোনো শরণাগতের প্রাণ রক্ষা করা একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব।

উপসংহার: রাজনীতি বা কূটনীতি এক জায়গায়, আর ভারতের হাজার বছরের ঐতিহ্য ‘ধর্ম’ অন্য জায়গায়। তিতির পাখি হোক বা কোনো রাষ্ট্রপ্রধান—ভারত শিখিয়েছে যে, যারা নিরাপদ আশ্রয় চায়, তাদের রক্ষা করা হলো বীরত্বের চূড়ান্ত লক্ষণ। দিল্লির দরবারে দাঁড়িয়ে ভারত যখন শেখ হাসিনাকে নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে, তখন তার পেছনে থাকবে হাজার বছরের এই সংকল্প।

Advertisements