
হরিয়ানার জিন্দ জেলা (Haryana)থেকে উঠে এল এক অনন্য ও একই সঙ্গে সমাজের গভীর বাস্তবতাকে সামনে আনা ঘটনা। টানা ১০ কন্যাসন্তানের পর অবশেষে পুত্রসন্তানের জন্ম দিলেন এক ৩৭ বছরের মহিলা। দীর্ঘ ১৯ বছরের দাম্পত্য জীবনে এটি তাঁর একাদশ সন্তান। ঘটনাটি যেমন পরিবারে আনন্দের ঢেউ এনেছে, তেমনই আবার দেশের একাংশে এখনও বিদ্যমান পুত্রসন্তান-প্রাধান্যের মানসিকতা ও মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
জিন্দ জেলার উচানা শহরের ওজস হাসপাতাল ও ম্যাটার্নিটি হোমে এই শিশুর জন্ম হয়। হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রসবটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ (হাই রিস্ক)। প্রসবের সময় মায়ের শরীরে তিন ইউনিট রক্ত দিতে হয়। তবে চিকিৎসকদের তৎপরতায় মা ও নবজাতক দু’জনেই বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ রয়েছেন।
রণক্ষেত্র রাজধানী! মাঝরাতে মসজিদ চত্বরে পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটবৃষ্টি
হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. নারবীর শেওরান জানান, “এটি একটি হাই রিস্ক ডেলিভারি ছিল। কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসা দেওয়ায় মা ও শিশু দু’জনেই এখন ভালো আছেন।” তিনি আরও বলেন, মহিলা ৩ জানুয়ারি হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরদিনই সন্তানের জন্ম দেন। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়া হয় এবং তিনি পাশের ফতেহাবাদ জেলার নিজের গ্রামে ফিরে যান।
১৯ বছরের অপেক্ষার অবসান
নবজাতকের বাবা সঞ্জয় কুমার (৩৮) পেশায় দিনমজুর। ২০০৭ সালে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর একে একে তাঁদের সংসারে আসে দশটি কন্যাসন্তান। সঞ্জয়ের কথায়, “আমরা ছেলে চেয়েছিলাম। শুধু আমি নই, আমার কয়েকজন বড় মেয়েও চাইত ওদের একটা ভাই হোক। এটা আমার একাদশ সন্তান, এর আগে আমার দশটা মেয়ে রয়েছে।”
তিনি দাবি করেন, সীমিত আয়ের মধ্যেও তিনি তাঁর সব সন্তানকে পড়াশোনা করানোর চেষ্টা করছেন। পরিবারের বড় মেয়ে সারিনা প্রায় ১৮ বছর বয়সী এবং সরকারি স্কুলে দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়ছে। তার পরের মেয়ে অমৃতা একাদশ শ্রেণির ছাত্রী। সুশীলা পড়ছে সপ্তম শ্রেণিতে, কিরণ ষষ্ঠ শ্রেণিতে, দিব্যা পঞ্চম শ্রেণিতে, মান্নাত তৃতীয় শ্রেণিতে, কৃতিকা দ্বিতীয় শ্রেণিতে, অমনিশ প্রথম শ্রেণিতে। নবম ও দশম কন্যা হল লক্ষ্মী ও বৈশালী। বৈশালীর পরই অবশেষে পরিবারে আসে পুত্রসন্তান।
ছেলের নাম দিলখুশ, বোনদেরই দেওয়া
সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়, নবজাতক পুত্রের নাম রেখেছে তার দশ দিদিই। বহু আলোচনার পর তারা ভাইয়ের নাম রাখে ‘দিলখুশ’, যার অর্থ—খুশি হৃদয়। পরিবারের সদস্যদের মতে, ১৯ বছরের অপেক্ষার পর ভাইয়ের আগমনে গোটা পরিবারে যে আনন্দ এসেছে, সেই অনুভূতিই নামের মধ্যে ধরা পড়েছে।
সঞ্জয় কুমার বলেন, “আমার দশটা মেয়েই ঈশ্বরের আশীর্বাদ। আমি তাদের বোঝা মনে করি না। যা হয়েছে, তা ভগবানের ইচ্ছা। আমি এতে খুশি।” যদিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, সঞ্জয় নিজের দশ কন্যার নাম মনে করতে গিয়ে কিছুটা হিমশিম খাচ্ছেন। সেই ভিডিও ঘিরেই শুরু হয় নানা আলোচনা ও সমালোচনা।
পুত্রসন্তান প্রাধান্য নিয়ে বিতর্ক
এই ঘটনা নতুন করে সামনে এনেছে ভারতের কিছু অংশে এখনও প্রচলিত পুত্রসন্তান-প্রাধান্যের মানসিকতা। যদিও সঞ্জয় কুমার দাবি করেছেন, তাঁর উপর কোনও সামাজিক বা পারিবারিক চাপ ছিল না এবং তিনি বিশ্বাস করেন আজকের দিনে মেয়েরাও সব ক্ষেত্রে সফল হতে পারে। তবে সমাজকর্মীদের মতে, বারবার সন্তান নেওয়ার পেছনে শুধু ব্যক্তিগত ইচ্ছা নয়, সামাজিক মানসিকতারও বড় ভূমিকা থাকে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারগুলিতে পুত্রসন্তানকে ভবিষ্যতের ভরসা হিসেবে দেখার প্রবণতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
হরিয়ানার লিঙ্গানুপাত ও বাস্তবতা
এই ঘটনা এমন এক সময় সামনে এল, যখন হরিয়ানার লিঙ্গানুপাত নিয়ে নিয়মিত নজরদারি চলছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রাজ্যে প্রতি হাজার পুরুষে নারীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯২৩। যদিও এটি আগের তুলনায় উন্নতি, তবুও জাতীয় গড়ের থেকে এখনও কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারিভাবে ‘বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও’-এর মতো প্রকল্প চালু থাকলেও সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনই আসল চ্যালেঞ্জ। জিন্দের এই পরিবার সেই দ্বন্দ্বকেই স্পষ্ট করে তুলে ধরেছে একদিকে দশ কন্যার শিক্ষার চেষ্টা, অন্যদিকে পুত্রসন্তানের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষা। সব মিলিয়ে, ‘দিলখুশ’-এর জন্ম শুধু একটি পরিবারের আনন্দের গল্প নয়, বরং ভারতীয় সমাজে লিঙ্গসমতা, মাতৃস্বাস্থ্য ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে চলমান বিতর্কেরই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।






