গোপীগঞ্জের অন্য আবদুলের কীর্তি জানলে অবাক হবেন

gopiganj-muslim-donates-land-ramleela-stage

লখনউ: সাম্প্রতিক সময়ে যখন ধর্মকে ঘিরে রাজনীতি, বিভাজন আর বিদ্বেষের (Muslim man donates land)খবরই বেশি শোনা যায়, ঠিক সেই সময় উত্তরপ্রদেশের ভাদোহি জেলার গোপীগঞ্জের বড়গাঁও থেকে উঠে এল এক ব্যতিক্রমী মানবিক কাহিনি। ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন দৃষ্টান্ত অনেকের চোখে জল এনে দিয়েছে। এখানে এক মুসলিম বৃদ্ধ তাঁর জীবনের শেষ সম্বল পরিত্যক্ত ঘর সমেত পূর্বপুরুষের জমি দান করে দিলেন রামলীলার স্থায়ী মঞ্চ তৈরির জন্য। নাম তাঁর আবদুল রহিম সিদ্দিকি, এলাকায় যিনি পরিচিত ‘কল্যাণ দর্জি’ নামে।

Advertisements

বড়গাঁও গ্রামের এই বাসিন্দা আজ প্রায় সত্তরের কোঠায়। জীবনের বড় একটা সময় তিনি কাটিয়েছেন রামলীলার সঙ্গে। ছোটবেলা থেকেই রামচরিতমানস, রামায়ণের চরিত্র তাঁর নখদর্পণে ছিল। মঞ্চে কখনও রাম, কখনও লক্ষ্মণ, কখনও অন্য কোনও চরিত্রে অভিনয় করেছেন। মুসলিম হয়েও রামলীলায় পাঠ করা তাঁর কাছে কখনও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। কারণ, তিনি বড় হয়েছেন এমন এক পরিবেশে, যেখানে ধর্মের আগে মানুষ, আর ভক্তির আগে সহাবস্থান।

   

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে দেশে ফিরছেন BNP চেয়ারম্যান তারেক

আবদুলের কথায়, “আমি কোনও প্রভাব বা চাপে পড়ে এই সিদ্ধান্ত নিইনি। রামলীলার মঞ্চের জন্য জমি দান করলাম একান্ত নিজের ইচ্ছেতেই। আমার একটাই আশা জীবদ্দশায় একবার ভগবানের দর্শন পাব। যেখানে এখন রয়েছি, সেখানে একদিন যেন ভগবানের রথ আসে। আমি আর আমার ভাই যেন সেটা চোখে দেখতে পাই।” তাঁর কণ্ঠে ছিল না কোনও রাজনৈতিক স্লোগান, ছিল শুধু একনিষ্ঠ ভক্তির সুর।

যে জমিটি তিনি দান করেছেন, সেটি প্রায় ২০০ বছরের পুরনো পারিবারিক সম্পত্তি। আবদুল জানান, ছোটবেলা থেকেই এই গ্রামে হিন্দু-মুসলিম মিলেমিশে থাকার ছবি দেখেছেন। বড়গাঁও গ্রামে প্রায় ছয় হাজার পরিবারের বাস। এখানে কোনওদিন সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ মাথাচাড়া দেয়নি বলেই দাবি স্থানীয়দের। তাঁদের মতে, “এই গ্রামে ১৯৩২ সাল থেকেই নিয়মিত রামলীলা হয়। কিন্তু এত বছরেও কোনও স্থায়ী মঞ্চ তৈরি হয়নি। কখনও খোলা মাঠে, কখনও অস্থায়ী কাঠামো বানিয়ে অনুষ্ঠান হত।”

কল্যাণ দর্জির ভূমিকা এই রামলীলায় বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এক সময় তিনি নিজেই মঞ্চে পাঠ করতেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শরীর সায় না দেওয়ায় অভিনয় ছাড়তে বাধ্য হন। কিন্তু তাতেও রামলীলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিন্ন হয়নি। মঞ্চ পরিচালনা, চরিত্র বণ্টন, প্রস্তুতির নানা দায়িত্ব তিনি কাঁধে তুলে নিতেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝেছিলেন, একটি স্থায়ী মঞ্চ কতটা জরুরি।

আবদুলের আক্ষেপ, “রাজ্যে রামের নামে অনেক রাজনীতি হয়। কিন্তু রামলীলার মতো ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির জন্য কেউ এগিয়ে এল না। গ্রামে কোটিপতি ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয় আছেন। সরকার চাইলে সামান্য জমি দিলেই স্থায়ী মঞ্চ হয়ে যেত। কিন্তু কেউ দেয়নি। এখন আমার বয়স ৭০। নেওয়ার কেউ নেই, দেওয়ারও তেমন কেউ নেই। তাই ভাবলাম, এই জমিটাই রামের নামে উৎসর্গ করি।”

শেষমেশ নিজের পরিত্যক্ত ঘর ভেঙে সেই জমি দান করে দিলেন তিনি আদর্শ রামলীলা সমিতির হাতে। ইতিমধ্যেই সেখানে স্থায়ী মঞ্চ তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কয়েক মাসের মধ্যেই নির্মাণ সম্পূর্ণ হবে বলে জানিয়েছেন সমিতির সদস্যরা। তাঁদের আশা, আগামী রামনবমীতেই নতুন মঞ্চে রামলীলার আসর বসবে।

গোপীগঞ্জের এই ‘অন্য আবদুল’-এর কীর্তি শুধু একটি জমি দানের ঘটনা নয়, বরং তা ধর্মীয় সম্প্রীতি, মানবিকতা আর ভারতীয় সংস্কৃতির বহুত্ববাদী চেতনার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। যখন চারদিকে বিভেদের দেয়াল তোলার চেষ্টা চলছে, তখন কল্যাণ দর্জির মতো মানুষরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন—রাম শুধু একটি ধর্মের নন, তিনি ভক্তির, সংস্কৃতির আর সহাবস্থানের প্রতীক।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements