নয়াদিল্লি: দেশজুড়ে ফের আন্দোলনে নেমেছেন গিগ ওয়ার্কাররা (Gig workers)। খাবার ডেলিভারি, রাইড-হেলিং, ই-কমার্স লজিস্টিক্স এই সমস্ত প্ল্যাটফর্মে কর্মরত লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের দাবি একটাই: ন্যূনতম মাসিক বেতন, সামাজিক সুরক্ষা এবং স্থায়ী কর্মসুবিধা। ইউনিয়নগুলির দাবি অনুযায়ী, গিগ ওয়ার্কারদের জন্য মাসিক ন্যূনতম ₹৪০,০০০ বেতন, পেনশন, স্বাস্থ্যবিমা এবং নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা নিশ্চিত করতে হবে।
গিগ ওয়ার্কার ইউনিয়নগুলির অভিযোগ, কমিশন-ভিত্তিক কাজের মডেল আসলে ন্যূনতম মজুরি আইনকে পাশ কাটিয়ে চলে। একজন ডেলিভারি পার্টনার বা রাইডার দিনে যত ঘণ্টাই কাজ করুন না কেন, কাজের নিশ্চয়তা নেই, আয়ের নিশ্চয়তা নেই এমনকি দুর্ঘটনা বা অসুস্থতার ক্ষেত্রে কোনও সামাজিক সুরক্ষাও নেই। ইউনিয়নের বক্তব্য, “আমরা কর্মী, কিন্তু আমাদের কর্মীর মর্যাদা দেওয়া হয় না।”
শিক্ষাঙ্গনে হিজাব-বোরখার প্রতিবাদে মুসলিম আইনজীবী
বিশেষ করে খাবার ও গ্রোসারি ডেলিভারি সেক্টরে ১০ থেকে ২০ মিনিটের ডেলিভারি টার্গেট নিয়ে তীব্র আপত্তি উঠেছে। গিগ ওয়ার্কারদের দাবি, এই অস্বাভাবিক সময়সীমা পূরণ করতে গিয়ে তাঁদের প্রাণের ঝুঁকি নিতে হয়। ট্রাফিক আইন উপেক্ষা করা, অতিরিক্ত গতিতে বাইক চালানো সবই যেন অলিখিত বাধ্যবাধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বহু ক্ষেত্রেই দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হওয়ার পর পরিবার ক্ষতিপূরণ পায় না বলেই অভিযোগ। একজন ডেলিভারি রাইডার বলেন, “অ্যাপে অর্ডার এলেই ঘড়ি চলতে শুরু করে। সময়মতো না পৌঁছালে রেটিং কমে যায়, ইনসেনটিভ কাটা যায়। নিরাপত্তার কথা কেউ ভাবে না।” ইউনিয়নগুলির দাবি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনও আপসের বিষয় হতে পারে না।
তবে এই দাবিকে ঘিরে প্রশ্নও উঠছে। গিগ অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্যই হল নমনীয়তা নিজের সময় অনুযায়ী কাজ করার স্বাধীনতা। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, যদি নির্দিষ্ট মাসিক বেতন ও স্থায়ী চুক্তি বাধ্যতামূলক করা হয়, তাহলে গিগ মডেলটাই ভেঙে পড়তে পারে। স্টার্টআপ ও প্ল্যাটফর্ম সংস্থাগুলির আশঙ্কা, এতে খরচ ব্যাপকভাবে বাড়বে, যা শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের উপর চাপবে বা কাজের সুযোগ কমে যাবে।
একজন অর্থনীতিবিদ বলেন, “স্থায়ী বেতন দিলে কোম্পানিগুলিকে কম কর্মী নিয়ে কাজ চালাতে হবে। এতে অনেক গিগ ওয়ার্কারই কাজ হারাতে পারেন।” অন্যদিকে শ্রম বিশেষজ্ঞদের যুক্তি, নমনীয়তা আর শোষণ এক জিনিস নয়। তাঁদের মতে, ন্যূনতম আয় ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করেই নমনীয় কাজের মডেল তৈরি করা সম্ভব।
সরকারের ভূমিকাও এই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যেই সামাজিক সুরক্ষা কোডে গিগ ও প্ল্যাটফর্ম ওয়ার্কারদের অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। তবে বাস্তবে সেই সুবিধা কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ইউনিয়নগুলির দাবি, আইনি স্বীকৃতি থাকলেও বাস্তবায়ন নেই।
এই আন্দোলনের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পরিষেবাতেও। একাধিক শহরে ডেলিভারি পরিষেবা ব্যাহত হয়েছে। গ্রাহকদের একাংশ গিগ ওয়ার্কারদের দাবির প্রতি সহানুভূতিশীল, আবার কেউ কেউ পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় ক্ষুব্ধ। সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন বড় গিগ ওয়ার্কারদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যূনতম আয় নিশ্চিত করা কি সম্ভব নমনীয় কাজের কাঠামোর মধ্যেই? নাকি স্থায়ী বেতনের দাবি শেষ পর্যন্ত কাজের সুযোগ কমিয়ে দেবে এবং পরিষেবার খরচ বাড়াবে? এই দ্বন্দ্বের মধ্যেই গিগ অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পথ খুঁজছে দেশ।
