দক্ষিণ ভারতের এক পরিবারে টানা তিনটি মৃত্যু— আর তার পেছনে উঠে এসেছে ভয়াবহ অভিযোগ। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে এক যুবক দাবি করেছেন, তাঁর স্ত্রী, বাবা ও মা– তিনজনই মারা গেছেন চিকিৎসা না পেয়ে, কারণ স্থানীয় একাধিক পাদরি নাকি তাঁদের চিকিৎসার বদলে শুধু ‘‘প্রার্থনা থেরাপি’’ (Faith healing ) গ্রহণ করতে বলেছিলেন। এই মর্মান্তিক সাক্ষাৎকার প্রকাশ্যে আসে ৩০ নভেম্বর ২০২৫-এ, @TheTreeni নামের অ্যাকাউন্ট থেকে। ভিডিওটি রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, বিশেষত যেখানে ধর্মান্তর সংক্রান্ত বিতর্ক ক্রমশ তীব্র হচ্ছেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে।
ধর্মান্তরের পর শুরু হয় ‘বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসা’— অভিযোগ পরিবারের
ভিডিওতে দেখা যায়, দক্ষিণ ভারতের এক ব্যক্তি চোখের জল সামলাতে সামলাতে বলছেন, তাঁর পরিবার কয়েক বছর আগে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। তখনই স্থানীয় চার্চ ও পাদরিদের সক্রিয় যোগাযোগ শুরু হয়। অভিযোগ, অসুস্থ হলেই তাঁদের বলা হত— ‘‘ঔষধে নয়, ঈশ্বরের প্রার্থনায় সব রোগ সারবে।’’
অভিযুক্ত পাদরিরা নাকি ইনজেকশন ও ওষুধ নেওয়া নিষিদ্ধ করেন। এমনকি জ্বরে কাঁপতে থাকা স্ত্রীকে হাসপাতালে না নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, ‘‘ঈশ্বর দেখছেন, ওষুধ নিলে পাপ হবে’’, এই ভয় দেখিয়ে থামানো হয়েছিল চিকিত্সা।
ভিডিওতে যুবক আরও জানান, তাঁর স্ত্রী এক সপ্তাহ ধরে অচিকিৎসিত জ্বরে ভুগে মারা যান। কিছুদিন পর একই পরিণতি হয় তাঁর বাবা ও মায়ের ক্ষেত্রে। তিনজনই নাকি বিশ্বাসভিত্তিক চিকিৎসার উপর নির্ভর করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।
ফেইথ হিলিং— বিতর্ক নতুন নয়, কিন্তু বাস্তব এখনও আতঙ্কজনক
ধর্মীয় প্রার্থনার মাধ্যমে রোগ সারানোর ধারণাকে বলা হয় ‘ফেইথ হিলিং’। বহু দেশে এর বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি রয়েছে। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলেও এ ধরনের প্রচলন কম নয়। ২০২০ সালে প্রকাশিত দ্য ল্যানসেট-এর একটি বিশ্লেষণ দেখিয়েছিল— ফেইথ হিলিং অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা বিলম্বিত করে, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত বা গ্রামীণ অঞ্চলে মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ায়।
এই ঘটনার ক্ষেত্রেও সেই চিত্রটাই যেন ফের সামনে এল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে, ভিডিও প্রকাশের পরও এখন পর্যন্ত কোনও পুলিশে অভিযোগ দায়ের বা সরকারি তদন্তের খবর পাওয়া যায়নি। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, ধর্মদূষণ ও ধর্মান্তরিত পরিবারের ওপর চাপ— এই দুইয়ের সংযোগে এমন ঘটনা অনেক সময় প্রকাশ্যে এলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
১১ রাজ্যের আইন থাকলেও নড়াচড়া নেই প্রশাসনের
ভারতের ১১টি রাজ্যে ধর্মান্তর প্রতিরোধ আইন রয়েছে, যেখানে জবরদস্তি, প্রলোভন বা প্রতারণার মাধ্যমে ধর্ম পরিবর্তনে উস্কানি অপরাধ হিসেবে গণ্য। কিন্তু এই ধরনের ‘চিকিৎসা-বর্জনের’ অভিযোগ আইনের আওতায় পড়ে কি না, তা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে—
- যদি প্রমাণ হয় যে ধর্মীয় গোষ্ঠী চিকিৎসা নিতে বাধা দিয়ে মৃত্যুর কারণ হয়েছে, তবে তা অবহেলার মাধ্যমে হত্যার ধারায় মামলা হতে পারে।
- আবার ধর্মান্তরের পর ‘‘নিয়ন্ত্রণমূলক প্রভাব’’ খাটালে তা ধর্মান্তর বিরোধী আইনেরও আওতায় আসতে পারে।
- কিন্তু এর জন্য অভিযোগ এবং তদন্ত— দুটোই লাগে, যা এখনও দাখিল হয়নি।
- সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ, তবে সমান্তরালে রাজনৈতিক উত্তাপও
ভিডিওটি ঘিরে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতের নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। অনেকে লিখছেন— ‘‘রোগে প্রার্থনার শক্তি আছে ঠিকই, কিন্তু তা কখনও বৈজ্ঞানিক চিকিৎসার বিকল্প নয়।’’
অন্যদিকে, ধর্মান্তর ও মিশনারি কর্মকাণ্ড নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও দানা বাঁধছে। বিরোধী দলগুলি বলছে— ‘‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার নামে প্রতারণা চলতে দেওয়া হচ্ছে’’। তবে শাসকদলীয় অংশ বলছে— ‘‘সরকারি তথ্য ছাড়া কারও দাবি সত্য ধরা উচিত নয়।’’
SHOCKING!
Poor man says pastors killed his entire family after conversion.
As per victim, wife (42) went mad and died after pastors stopped medical treatment, father denied injection during heart attack, mother also died same way.
Man crying says pastors destroyed his… pic.twitter.com/1e1fV5bMFY
— Treeni (@TheTreeni) November 30, 2025
পুলিশ নড়েচড়ে বসবে কি? উত্তর খুঁজছে পরিবার
ভিডিওতে যুবক অনুরোধ করেছেন, ‘‘আর কোনও পরিবার যেন আমাদের মতো না ভোগে।’’ তিনি প্রশাসনের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন, যদিও তাঁর পরিবার এখনও অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার কথা ভাবছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
তবে ঘটনার গুরুত্ব দেখে স্থানীয় প্রশাসন নিজস্ব উদ্যোগে তদন্ত শুরু করবে কিনা— সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। কারণ, ‘‘বিশ্বাস’’ আর ‘‘চিকিৎসা’’— এই দুইয়ের সংঘর্ষ বহুবার প্রমাণ করেছে, ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য চুকোতে হয় সাধারণ মানুষকেই।
