
নয়াদিল্লি: ভারতের গণতন্ত্রের মূল স্তম্ভ (Election Commission SIR initiative) ভোটার তালিকাকে আরও নির্ভুল এবং আপডেটেড করার জন্য নির্বাচন কমিশন (ECI) বড় উদ্যোগ নিচ্ছে। স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR) বা ভোটার তালিকার বিশেষ পুনর্বিবেচনা প্রক্রিয়াকে রুটিন করে তোলার পরিকল্পনা করছে কমিশন, যাতে প্রতি ৫-৬ বছর অন্তর এই কাজ বাধ্যতামূলক হয়। বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে ভোটার তালিকা প্রতি বছর বা দু’বছর অন্তর রিফ্রেশ করা হয়, কিন্তু ভারতে গত ২১ বছর ধরে এই বড় ধরনের রিভিশন হয়নি।
এই দীর্ঘ বিলম্বের ফলে তালিকায় অযোগ্য ব্যক্তির নাম যুক্ত হওয়া, মৃত ব্যক্তির নাম অমুছে থাকা এবং যোগ্য ভোটারদের বাদ পড়ার মতো সমস্যা দেখা দিয়েছে। SIR-কে গণতন্ত্র শক্তিশালী করার হাতিয়ার হিসেবে দেখে ECI এখন নিয়মসমূহ সংশোধনের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এই প্রক্রিয়া নিয়মিত হয় এবং নির্বাচনের সততা অটুট থাকে।এই উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের SIR প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে।
১০০ দিনের প্রকল্পে কেন্দ্রের শর্তে ক্ষুব্ধ মমতা, কোচবিহারে কাগজ ছিঁড়ে প্রতিবাদ
২৭ অক্টোবর ECI-এর আদেশে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ার ফেজ-১ বিহারে সফলভাবে শেষ হয়েছে, যেখানে ৭.৯ কোটি ভোটারের তালিকা যাচাই করা হয়েছে। ফেজ-২ ৪ নভেম্বর থেকে ৯টি রাজ্য—ছত্তিশগড়, গোয়া, গুজরাত, কেরালা, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, তামিলনাড়ু, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ—এবং ৩টি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল—আন্দামান ও নিকোবর, লাক্ষাদ্বীপ, পুডুচেরি—এ চলছে। এতে প্রায় ৫১ কোটি ভোটারের তালিকা আচ্ছাদিত, যা ৩২১ জেলা এবং ১,৮৪৩টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে বিস্তৃত।
গত ৯ ডিসেম্বরের তথ্য অনুসারে, ৯৯.৯৭ শতাংশ (৫০.৯৫ কোটি) ভোটারের কাছে এনুমারেশন ফর্ম (EF) পৌঁছে গেছে এবং ৫০.৫৮ কোটি ফর্ম ডিজিটাইজড হয়েছে। ফর্ম জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১১ ডিসেম্বর, কেরলে ১৮ ডিসেম্বর।SIR-এর মূলে রয়েছে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করা। বুথ লেভেল অফিসার (BLO) দ্বারা ঘরে ঘরে গিয়ে যাচাই, নতুন নাগরিকদের অন্তর্ভুক্তি, অযোগ্য নাম মুছে ফেলা এবং ডকুমেন্ট যাচাই—এসবের মাধ্যমে প্রক্রিয়া চলে।
বিহারে এই প্রক্রিয়ায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম মুছে ফেলা হয়েছে, যা সর্বোচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হয়েছে। কমিশন বলছে, এটা নির্বাচনের সততা রক্ষার জন্য অপরিহার্য। চিফ ইলেকশন কমিশনার গিয়নেশ কুমার বলেছেন, “SIR গণতন্ত্রের ভিত্তি শক্তিশালী করে। বিশ্বের অন্যান্য দেশ যেমন যুক্তরাষ্ট্র বা যুক্তরাজ্যে নিয়মিত রিভিশন হয়, ভারতেও এটা বাধ্যতামূলক করতে হবে।” নিয়ম সংশোধনের মাধ্যমে প্রতি ৫-৬ বছরে SIR বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাবটি ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনের আগে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু এই উদ্যোগ রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দলগুলো—কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সিপিআই(এম), সামাজবাদী পার্টি, ডিএমকে এবং আরজেডি—এটাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসা’ বলে অভিহিত করছে। পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরায় বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসীদের ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে, যা NRC-এর ছায়া তুলে ধরেছে।
যোগেন্দ্র যাদবের মতো নেতারা বলছেন, “SIR, ডিলিমিটেশন এবং ONOE মিলে বিজেপি-বিরোধী অঞ্চলের প্রভাব কমাচ্ছে। এটা গণতন্ত্রের অবনতি।” কংগ্রেস এমপি মণিশ তিওয়ারি লোকসভায় SIR নিয়ে বক্তৃতায় বলেছেন, “কমিশনকে স্বাধীন রাখতে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে আলোচনা দরকার।” আজ (৯ ডিসেম্বর) সুপ্রিম কোর্টও পশ্চিমবঙ্গে SIR-এর সময় ল অ্যান্ড অর্ডার সমস্যায় হস্তক্ষেপের নির্দেশ দিয়েছে।
ECI-এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এটা কোনো রাজনৈতিক কারসাজি নয়। ৫.৩ লক্ষ BLO, ৭.৬৪ লক্ষ বুথ লেভেল এজেন্ট (BLA), ১০,৪৪৮ ইলেকটোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার (ERO/AERO) এবং ৩২১ জেলা নির্বাচন অফিসার (DEO) এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত। রাজনৈতিক দলগুলোর BLA-রা সহযোগিতা করছেন।
পশ্চিমবঙ্গে ৫ জন সিনিয়র আইএএস অফিসারকে স্পেশাল রোল অবজার্ভার নিযুক্ত করা হয়েছে, যাতে স্বচ্ছতা বাড়ে। কেরালায় ২৩ বছর পর এই প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে পুরনো ভোটার আইডি নম্বর দিয়ে ওয়েবসাইটে তথ্য খুঁজে না পাওয়ায় যুবক এবং NRI-রা সমস্যায় পড়ছেন। সাহায্য ক্যাম্প চালু হয়েছে, যাতে BLO-রা সাহায্য করছেন।










