
চেন্নাই: ব্যস্ত মহানগর জীবনে প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে ব্যাগ, (Chennai)মোবাইল কিংবা মূল্যবান জিনিস। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেগুলি আর ফিরে পাওয়া যায় না। কিন্তু তামিলনাড়ুর রাজধানী চেন্নাইয়ে এক সাফাইকর্মীর সততা প্রমাণ করে দিল—আজও সমাজে নৈতিকতা বেঁচে আছে।
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকার সোনার গয়না ভরতি ব্যাগ কুড়িয়ে পেয়ে এক মুহূর্তের জন্যও লোভে না পড়ে তা পুলিশের হাতে তুলে দিলেন সাফাইকর্মী এস. পদ্মা। তাঁর এই অনন্য সততার জন্য রাজ্য সরকারের তরফে মিলল ১ লক্ষ টাকার পুরস্কার।
সততার নজির! সোনার গয়না ভরতি ব্যাগ ফেরালেন সাফাইকর্মী
ঘটনাটি ঘটে ২০২৬ সালের ১১ জানুয়ারি। চেন্নাইয়ের অন্যতম ব্যস্ত এলাকা টি. নগর। প্রতিদিনের মতো সেদিনও একটি মন্দির সংলগ্ন রাস্তায় সাফাইয়ের কাজ করছিলেন এস. পদ্মা। হঠাৎই রাস্তার ধারে পড়ে থাকা একটি ব্যাগ তাঁর নজরে আসে। প্রথমে তিনি সেটিকে আবর্জনা ভেবেই এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ব্যাগটি তুলতে গিয়ে অস্বাভাবিক ভারী মনে হওয়ায় সন্দেহ জাগে তাঁর মনে। এরপর ব্যাগ খুলতেই চোখ কপালে ওঠে ভিতরে ছিল সোনার হার, চুড়ি, আংটি সহ নানা মূল্যবান গয়না।
পরে হিসাব করে জানা যায়, ব্যাগে ছিল প্রায় ৪৫ সার্বভৌম সোনা, যার ওজন আনুমানিক ৩৬০ গ্রাম এবং বাজারমূল্য প্রায় ৪৫ লক্ষ টাকা। এমন বিপুল সম্পদের সামনে দাঁড়িয়েও পদ্মার মনে কোনও লোভ জন্মায়নি। আশপাশে থাকা কয়েকজন সহকর্মী তাঁকে ব্যাগটি নিজের কাছে রেখে দেওয়ার পরামর্শ দেন। তাঁদের যুক্তি ছিল, রাস্তায় পড়ে যাওয়া জিনিসের মালিককে খুঁজে পাওয়া প্রায় অসম্ভব। কিন্তু পদ্মা স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, এই গয়না তাঁর নয় এবং অন্যের জিনিস নিজের কাছে রাখা অন্যায়।
এক মুহূর্ত দেরি না করে তিনি সরাসরি পন্ডি বাজার থানায় গিয়ে ব্যাগটি পুলিশের হাতে তুলে দেন। চেন্নাই পুলিশ বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। খুব দ্রুতই জানা যায়, ব্যাগটির মালিক একজন গয়নার ব্যবসায়ী। ওই ব্যবসায়ী মন্দিরে পুজো দিতে এসে অসাবধানতাবশত ব্যাগটি রাস্তায় ফেলে যান। কিছুক্ষণ পর বিষয়টি বুঝতে পেরে আতঙ্কে তিনি থানায় অভিযোগ জানান। ঠিক তখনই পুলিশ তাঁকে জানায়, তাঁর হারানো ব্যাগ ইতিমধ্যেই উদ্ধার হয়েছে।
নিজের চোখে সোনার গয়না অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেয়ে আবেগে ভেঙে পড়েন ওই ব্যবসায়ী। তিনি সাফাইকর্মী পদ্মার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং বলেন, “আজ যদি এই ব্যাগ অন্য কারও হাতে পড়ত, তাহলে হয়তো জীবনের সঞ্চয় আর ফিরে পেতাম না।”
চেন্নাই পুলিশের পক্ষ থেকেও পদ্মার সততার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়। তাঁর ঊর্ধ্বতন আধিকারিকরা জানান, স্বল্প আয়ের মানুষ হয়েও পদ্মা যে নৈতিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তা গোটা সমাজের জন্য শিক্ষণীয়। ঘটনার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সোশ্যাল মিডিয়ায়। হাজার হাজার মানুষ এই ঘটনায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে পদ্মার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। অনেকেই লেখেন, “সততা এখনও মরে যায়নি, শুধু সঠিক মানুষের হাতে ধরা পড়ে না।”
এই খবর পৌঁছায় তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিনের কাছেও। তিনি নিজে এই ঘটনাকে ব্যতিক্রমী সততার উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে এস. পদ্মাকে ১ লক্ষ টাকা আর্থিক পুরস্কার দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রীর দফতর জানায়, সমাজে নৈতিক মূল্যবোধ জাগ্রত রাখতে এই ধরনের মানুষদের সম্মানিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
নিজের প্রতিক্রিয়ায় পদ্মা বলেন, “আমি গরিব হতে পারি, কিন্তু সততা ছাড়া জীবন কল্পনা করতে পারি না। এই সোনা হয়তো আমার অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারত, কিন্তু অন্যের সম্পত্তি নিজের করে নেওয়া আমার বিবেকে সায় দেয়নি।”
বর্তমান সময়ে যখন দুর্নীতি, স্বার্থপরতা ও অনৈতিকতার খবরই বেশি সামনে আসে, তখন এস. পদ্মার মতো মানুষ সমাজে আশার আলো দেখান। ৪৫ লক্ষ টাকার সোনা ফিরিয়ে দিয়ে ১ লক্ষ টাকা পুরস্কার পাওয়ার এই ঘটনা শুধু একটি মানবিক গল্প নয়, বরং মনে করিয়ে দেয়—মানুষের আসল সম্পদ তার চরিত্র, আর সততাই সবচেয়ে বড় অলংকার।





