
অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলতে কখনও পিছপা হন না জাভেদ আখতার (Javed Akhtar)। আর সেই ধারাবাহিকতাই দেখা গেল SOA লিটারারি ফেস্টিভ্যাল ২০২৫–এর মঞ্চে। প্রবীণ গীতিকার ও চিত্রনাট্যকার স্পষ্ট ভাষায় প্রশ্ন ছুড়ে দেন—“একজন নারী কেন নিজের মুখ নিয়ে লজ্জা বোধ করবেন?” বোরখা ও মুখ ঢাকা প্রথা ঘিরে তাঁর এই মন্তব্য নতুন করে সামাজিক বিতর্ক উসকে দেয়। আখতারের বক্তব্যে উঠে আসে পছন্দের স্বাধীনতা, মর্যাদা এবং সমাজে গেঁথে থাকা মানসিক চাপে নারীদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বাস্তবতা।
ইন্ডিয়ান পারফর্মিং রাইটস সোসাইটি (IPRS) আয়োজিত এবং সংস্কৃতি মন্ত্রকের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত এই আলোচনাসভায় জাভেদ আখতার প্রশ্ন তোলেন, সমাজে কেন নারীদের মুখ ঢাকার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তাঁর মতে, বিষয়টি শুধু ধর্মীয় অনুশাসন বা ব্যক্তিগত পছন্দের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের সামাজিক conditioning বা মানসিক গড়ন। তিনি বলেন, বহু ক্ষেত্রেই এই সিদ্ধান্ত স্বেচ্ছায় নয়, বরং চারপাশের চাপ থেকেই আসে।
আখতারের বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায় “পছন্দ” শব্দটি। তাঁর মতে, প্রকৃত পছন্দ তখনই সম্ভব, যখন একজন মানুষ ভয়, চাপ বা সামাজিক বিচার থেকে মুক্ত থেকে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, যদি কোনও নারী সত্যিই নিজের ইচ্ছায় মুখ ঢাকতে চান, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার কারও নেই। কিন্তু সেই ইচ্ছা যদি সমাজের চোখরাঙানি, পরিবার বা সম্প্রদায়ের চাপ থেকে জন্ম নেয়, তাহলে সেটিকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত বলা যায় না। এখানেই তিনি মূল সমস্যার জায়গাটি তুলে ধরেন।
এই সেশনটি ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে ইন্টার্যাকটিভ পর্বে। এক তরুণী প্রশ্ন তোলেন জাভেদ আখতারের আগের একটি মন্তব্য প্রসঙ্গে, যেখানে তিনি বলেছিলেন যে তিনি এমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, যেখানে মহিলারা বোরখা পরতেন না। সেই তরুণীর প্রশ্ন ছিল—মুখ বা শরীর ঢেকে রাখা কি একজন নারীকে কম শক্তিশালী করে তোলে? এই প্রশ্নের উত্তরে আখতার অত্যন্ত খোলামেলা ও সোজাসাপ্টা ভাষায় নিজের মত তুলে ধরেন।
আখতারের মতে, শক্তি কোনও পোশাকের ওপর নির্ভর করে না। একজন নারী বোরখা পরেও শক্তিশালী হতে পারেন, আবার না পরেও হতে পারেন। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন কোনও নির্দিষ্ট পোশাককে শক্তি বা নৈতিকতার মানদণ্ড বানানো হয়। তিনি বলেন, “যে মুহূর্তে সমাজ ঠিক করে দেয় কী পরলে তুমি ভালো নারী, আর কী না পরলে তুমি খারাপ—সেই মুহূর্তেই স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়।” তাঁর এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, তিনি পোশাক নয়, মানসিকতার প্রশ্ন তুলছেন।
জাভেদ আখতার আরও বলেন, মুখ মানুষের পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুখ ঢেকে রাখার ধারণার সঙ্গে লজ্জা, ভয় বা নিয়ন্ত্রণের ভাব জড়িয়ে আছে কি না, সেই প্রশ্ন করাই জরুরি। তাঁর মতে, একজন পুরুষের ক্ষেত্রে মুখ ঢাকার কোনও সামাজিক বাধ্যবাধকতা নেই, অথচ নারীর ক্ষেত্রেই কেন এই নিয়ম বারবার সামনে আসে—এই দ্বিচারিতা নিয়েই ভাবা দরকার।
এই আলোচনা সভা শুধুমাত্র বোরখা প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি আসলে বৃহত্তর অর্থে নারীস্বাধীনতা, সামাজিক নিয়ম এবং ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সংঘাত নিয়ে একটি গভীর সংলাপের জন্ম দেয়। উপস্থিত বহু ছাত্রছাত্রী ও শ্রোতা আখতারের বক্তব্যে সহমত প্রকাশ করেন, আবার কেউ কেউ ভিন্নমতও পোষণ করেন। তবে এক বিষয়ে সবাই একমত—এই ধরনের আলোচনা সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখায়।










