
ভরুচ, গুজরাত: মানবপাচারের বিরুদ্ধে বড়সড় সাফল্য পেল (Bangladeshi women rescued in Gujarat)আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫-এ ভরুচ জেলায় একটি স্পা-সহ একাধিক গেস্ট হাউসে হানা দিয়ে ১২ জন বাংলাদেশি মহিলা ও পশ্চিমবঙ্গের ২ জন মহিলাকে উদ্ধার করেছে Gujarat Police। অভিযানে ধরা পড়েছে বাংলাদেশের নাগরিক ফারুক শেখ-সহ মোট পাঁচজন অভিযুক্ত। পুলিশ জানিয়েছে, ভুয়ো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে এই মহিলাদের সীমান্ত পেরিয়ে আনা হয়েছিল এবং পরে জোর করে দেহব্যবসায় নামানো হয়।
পুলিশ সূত্রে খবর, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ভরুচ শহর ও সংলগ্ন এলাকায় একযোগে অভিযান চালানো হয়। একটি নামী স্পা ও কয়েকটি গেস্ট হাউস থেকে উদ্ধার হওয়া মহিলাদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে উঠে এসেছে ভয়াবহ চিত্র। অধিকাংশই কাজের প্রতিশ্রুতি—স্পা থেরাপিস্ট, হাউসকিপিং বা সেলস স্টাফ—দিয়ে ভারতে আনা হয়। পরে তাদের পাসপোর্ট ও নথি কেড়ে নিয়ে হুমকি-ধামকি দিয়ে যৌন শোষণে বাধ্য করা হয়।
ভোট-পরবর্তী হিংসায় উত্তাল কেরল, বিরোধীদের উপর সিপিএমের তাণ্ডব!
এই চক্রের মাথা হিসেবে ধরা পড়েছে ফারুক শেখ। পুলিশ জানিয়েছে, ফারুক সীমান্ত পারাপারের লজিস্টিকস, থাকার ব্যবস্থা ও “কাস্টমার ম্যানেজমেন্ট”—সবকিছুর তদারকি করত। তার সঙ্গে যুক্ত ছিল চারজন ভারতীয় মধ্যস্থতাকারী, যারা স্থানীয় স্পা ও গেস্ট হাউসের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মহিলাদের সরবরাহ করত। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবপাচার, বেআইনি আটক, যৌন শোষণ ও নথি জালিয়াতির ধারায় মামলা রুজু হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া মহিলাদের আপাতত নিরাপদ আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। তাঁদের শারীরিক পরীক্ষা ও কাউন্সেলিং চলছে। প্রশাসন সূত্রে জানানো হয়েছে, কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা করা হবে। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের দুই মহিলার পরিবারকেও খবর দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ প্রকাশ করেছে Times Now। সেখানে দেখা যায়, পুলিশের হেফাজতে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা মুখ ঢাকা মহিলারা এবং হাতকড়া পরা অভিযুক্তরা। ফুটেজটি অভিযানের সমন্বয় ও তৎপরতার চিত্র তুলে ধরে এবং পাচারচক্রের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আঘাতের বার্তা দেয়।
মানবপাচার যে কেবল রাজ্য-সীমার সমস্যা নয়, তা আবারও স্পষ্ট হলো। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, এই চক্রের শিকড় একাধিক রাজ্যে ছড়ানো। গুজরাত ছাড়াও মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের কিছু স্পা-গেস্ট হাউসের নাম উঠে এসেছে। আর্থিক লেনদেনের সূত্র ধরে আরও গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছে না পুলিশ।
পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক। দক্ষিণ এশিয়ায় মানবপাচারের প্রবণতা নিয়ে NCBI-তে প্রকাশিত ২০০৮ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ভুক্তভোগীদের একটি বড় অংশ—প্রায় ৮০ শতাংশ—বাণিজ্যিক যৌন শোষণের জালে পড়ে। যদিও গবেষণাটি পুরনো, তবু সাম্প্রতিক অভিযানের তথ্য সেই আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে আনছে।
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা, ভুয়ো চাকরির বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসন—এই তিনটি স্তম্ভে একসঙ্গে কাজ না করলে সমস্যার মূলে আঘাত করা যাবে না। একই সঙ্গে স্পা ও গেস্ট হাউসের লাইসেন্সিং ও নিয়মিত অডিটের দাবি উঠছে।
পুলিশের আশ্বাস, তদন্তের পরিধি বাড়ানো হবে এবং পাচারচক্রের আর্থিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই লক্ষ্য। উদ্ধার হওয়া মহিলাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষা করে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে প্রশাসন। এই অভিযানে একদিকে যেমন কয়েকজনের জীবন নতুন করে শুরু করার সুযোগ মিলল, তেমনই মানবপাচারের বিরুদ্ধে কড়া বার্তাও গেল—আইনের চোখ এড়ানো আর সহজ নয়।










