
ঢাকা: দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল ঢাকা (Bangladesh Pakistan China alliance)। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরেই শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা। তিনি সরাসরি ইঙ্গিত দিয়েছেন পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে এবং ভারতকে বাদ দিয়ে একটি আঞ্চলিক জোট সম্ভব, এবং কৌশলগত পরিস্থিতি অনুকূল হলে বাংলাদেশ তাতেও অংশ নিতে পারে।
এমন মন্তব্য একেবারেই হালকা নয়। কারণ এটি এসেছে এমন সময়, যখন পাকিস্তানের ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী ইশাক দার দাবি করেছিলেন ‘বাংলাদেশ–চীন–পাকিস্তান’—নতুন এক ত্রিপক্ষীয় জোট তৈরি হওয়ার পথে রয়েছে। তাঁর কথাই বর্তমানে ঢাকার বক্তব্যের সঙ্গে যেন অদ্ভুতভাবে মিলে যাচ্ছে।
দরকার একটু পিছনে তাকানো। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে স্থিতিশীল কূটনৈতিক অংশীদারিত্বগুলোর একটি। সীমান্ত, জলবণ্টন, জ্বালানি, সংযোগ—দুই দেশই এগিয়েছে যৌথভাবে। অনেকের মতে, ঢাকা-দিল্লির এই ঘনিষ্ঠতাই অঞ্চলে চীনের প্রভাব কমিয়ে রেখেছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি সেই জায়গায় নেই। নতুন প্রশাসনের টোন, বিশেষ করে বিদেশ নীতি নিয়ে, অনেকটাই “ব্যালান্সিং” এমনটাই দেখছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। আর সেই ব্যালান্সিংয়ের পরবর্তী ধাপই কি এবার “চীন–পাকিস্তানের দিকে কৌশলগত ঝুঁকে পড়া”?
এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র। তৌহিদ হোসেন বলেছেন, “একটি আঞ্চলিক ফোরাম বা জোট, যেখানে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থাকতে পারে, এবং যেখানে ভারতের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক নয় স্ট্র্যাটেজিক ক্যালকুলেশনে এটি অসম্ভব নয়।” তাঁর এই ভাষণই ঢাকার অবস্থানের বড় পরিবর্তনের সংকেত দিচ্ছে।
বাংলাদেশের ভূ-অর্থনীতি ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় চীনের প্রবল আগ্রহ নতুন নয়। করিডর, ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন, লজিস্টিক্স—সব ক্ষেত্রেই চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে পুরনো সামরিক সহযোগিতাও রয়েছে। সেসব মিলিয়েই সম্ভবত একটি সম্ভাব্য আঞ্চলিক ফ্রেমওয়ার্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হতে পারে যা ভারতকে বাদ দিয়ে চলবে।
ভূ-কৌশলগত দৃষ্টিকোণ দিল্লির পূর্ব সীমান্তে যদি চীন–পাকিস্তান সমন্বিত প্রভাব বাড়ে, তা ভারতের জন্য একটি বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বাণিজ্য ও সংযোগ প্রকল্প বাংলাদেশ এখন ভারতের উত্তর-পূর্বের জন্য অন্যতম লজিস্টিক লাইফলাইন। কৌশলগত সরে যাওয়া সেই সুবিধাকে জটিল করতে পারে। রাজনৈতিক বার্তা বাংলাদেশের এই পুনর্বিন্যাস দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে ভারতের ‘স্বাভাবিক নেতৃত্ব’ ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ অবশ্য দাবি করছে তাদের নীতি ‘ভারসাম্যপূর্ণ’, এবং কোনও জোটের লক্ষ্য নয় কোনও দেশকে বাদ দেওয়া। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন “যখন প্রকাশ্যে বলা হয় যে ভারতের বাইরে একটি জোট সম্ভব, তখন সেটি কেবল ‘ডিপ্লোম্যাটিক ব্যালান্সিং’ নয়, বরং কৌশলগত দিক বদলের সংকেত।” ভারতও পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। দিল্লির কূটনৈতিক মহলে নীরবতা বজায় থাকলেও, অনেকে মনে করছেন যে ভবিষ্যৎ বৈঠকে ভারত পরিষ্কারভাবে জানতে চাইবে ঢাকার এই নতুন অবস্থান ঠিক কতটা গভীর।
একটা জিনিস পরিষ্কার হাসিনা-পরবর্তী বাংলাদেশে ভূ-রাজনীতি দ্রুত বদলাচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের ঢেউ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম দেশ ভারতের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে বই কমাচ্ছে না। আগামী কয়েক মাসেই স্পষ্ট হবে এটি কেবল কূটনৈতিক ‘কথার খেলা’, নাকি বাস্তবেই দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন শক্তির অক্ষ তৈরি হচ্ছে।










