সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন সুবিধা, এবার ছুটি পাবেন সিঙ্গল ফাদার

অসম সরকার রাজ্য সরকারি বিভাগে কর্মরত একক পিতাদের জন্য সন্তান পরিচর্যা ছুটি (Child Care Leave বা সিসিএল) প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঘোষণা রবিবার মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত…

A single male government employee in India, dressed in formal attire, holding a child in his arms

অসম সরকার রাজ্য সরকারি বিভাগে কর্মরত একক পিতাদের জন্য সন্তান পরিচর্যা ছুটি (Child Care Leave বা সিসিএল) প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ঘোষণা রবিবার মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা করেছেন। তিনি এক্স (X) প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, “কখনও কখনও জীবনে অপ্রত্যাশিত মোড় আসে এবং একজন পুরুষকে তার সন্তানের একমাত্র পরিচর্যাকারী হতে হয়। আমাদের রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের জন্য এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে, আমরা আপনাদের পাশে আছি।”

   

তিনি আরও যোগ করেছেন, “এখন থেকে, আমরা একক পিতাদের তাদের ছোট্ট সন্তানদের দেখাশোনার জন্য সন্তান পরিচর্যা ছুটি প্রদান করব।” এই পদক্ষেপ অসম সরকারের কর্মচারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যা তাদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে।

Advertisements

সন্তান পরিচর্যা ছুটি কী?

সন্তান পরিচর্যা ছুটি (সিসিএল) হলো এমন একটি সুবিধা, যা কর্মচারীদের তাদের সন্তানদের দেখাশোনার জন্য প্রদান করা হয়। এই ছুটির সময় বেতন কাটা বা চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তার প্রয়োজন হয় না। অসমে এবং ভারতের অন্যান্য রাজ্যে এই ছুটি মূলত মহিলা সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য ছিল। তারা এটি সন্তানের অসুস্থতা, পরীক্ষা বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের সময় ব্যবহার করতে পারতেন। তবে, সাম্প্রতিক সরকারি নির্দেশনার পর এই সুবিধা একক পুরুষ সরকারি কর্মচারীদের জন্যও প্রসারিত করা হয়েছে।

নতুন নীতি এবং যোগ্যতার মানদণ্ড

অসম সরকারের এই নতুন নীতি অনুযায়ী, যে পুরুষ কর্মচারীরা বিপত্নীক, বিবাহবিচ্ছেদপ্রাপ্ত বা অবিবাহিত এবং সন্তানের একমাত্র অভিভাবক, তারা এই ছুটির জন্য যোগ্য। যোগ্যতার মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে:
কর্মচারীকে অসম সরকারের অধীনে সরকারি চাকরিতে নিযুক্ত থাকতে হবে।
ছুটি ১৮ বছরের কম বয়সী সন্তানদের জন্য প্রযোজ্য।
এটি জৈবিক, দত্তক বা আইনত নির্ভরশীল সন্তানদের জন্য ব্যবহার করা যাবে।

এই সংশোধনীর ফলে একক পিতারাও এখন সিসিএল-এর সুবিধা পাবেন। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যোগ্য কর্মচারীরা সর্বাধিক দুই বছর (৭৩০ দিন) ছুটি নিতে পারবেন। এছাড়া, যেসব কর্মচারীদের প্রতিবন্ধী সন্তান রয়েছে, তারাও এই সংশোধিত নীতির আওতায় সুবিধা পাবেন। ছুটি একাধিক পর্যায়ে নেওয়া যাবে, তবে একটি ক্যালেন্ডার বছরে তিনবারের বেশি নয়।

একজন সিনিয়র সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “প্রথম ৩৬৫ দিনের জন্য পূর্ণ বেতন প্রদান করা হবে, এবং পরবর্তী ৩৬৫ দিনের জন্য ৮০ শতাংশ বেতন দেওয়া হবে। তবে, ছুটি একবারে ন্যূনতম ১৫ দিনের জন্য নিতে হবে। এই ছুটি নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমোদন প্রয়োজন, যাতে সরকারি কাজে কোনও বিঘ্ন না ঘটে।”

নীতির তাৎপর্য

এই সিদ্ধান্ত অসম সরকারের কর্মচারীদের জন্য একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পূর্বে এই ছুটি কেবল মহিলা কর্মচারীদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল, যারা তাদের সন্তানদের লালন-পালন এবং জরুরি প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করতেন। কিন্তু এখন একক পিতাদের জন্য এই সুবিধা চালু করা একটি প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এটি সমাজে লিঙ্গ সমতার দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয় এবং একক পিতৃত্বের চ্যালেঞ্জগুলোকে স্বীকৃতি দেয়।

মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তার বক্তব্যে এই নীতির মানবিক দিকটির উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, জীবনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, এবং এমন সময়ে সরকারি কর্মচারীদের পাশে থাকা সরকারের দায়িত্ব। এই পদক্ষেপ একক পিতাদের তাদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে সহায়তা করবে এবং তাদের মানসিক চাপ কমাবে।

ভারতের প্রেক্ষাপটে সিসিএল (Child Care Leave)

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সন্তান পরিচর্যা ছুটি মহিলা কর্মচারীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠিত সুবিধা। কেন্দ্রীয় সরকারও ২০২০ সালে একক পুরুষ কর্মচারীদের জন্য এই ছুটি চালু করেছিল। অসম সরকারের এই সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং রাজ্যের কর্মচারীদের জন্য একটি আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে। এটি বিশেষ করে প্রতিবন্ধী সন্তানদের অভিভাবকদের জন্যও একটি বড় সুবিধা, কারণ তাদের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শিথিল করা হয়েছে।

সমাজ ও কর্মক্ষেত্রে প্রভাব

এই নীতি সমাজে পিতৃত্বের ভূমিকা সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে পারে। একক পিতারা প্রায়ই সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে সামাজিক ও আর্থিক চাপের সম্মুখীন হন। এই ছুটি তাদের কাজ এবং পারিবারিক জীবনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা করবে। একই সঙ্গে, এটি কর্মক্ষেত্রে কর্মচারীদের মনোবল বাড়াতে এবং তাদের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

একজন সমাজবিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন, “এই পদক্ষেপ লিঙ্গভিত্তিক ভূমিকার প্রথাগত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। এটি প্রমাণ করে যে পুরুষরাও সন্তানের প্রাথমিক পরিচর্যাকারী হতে পারেন এবং তাদেরও সরকারি সমর্থন প্রয়োজন।”

বাস্তবায়ন ও চ্যালেঞ্জ

এই নীতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে কিছু চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। ছুটির আবেদন প্রক্রিয়া সহজ করা, কর্মক্ষেত্রে স্টাফের ঘাটতি এড়ানো এবং কর্মচারীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা গুরুত্বপূর্ণ হবে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই ছুটি সরকারি কাজে বাধা না সৃষ্টি করে যাতে কার্যকর হয়, তার জন্য সঠিক পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

অসম সরকারের এই সিদ্ধান্ত একক পিতাদের জন্য একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। সর্বাধিক ৭৩০ দিনের এই ছুটি তাদের সন্তানদের সঙ্গে সময় কাটাতে এবং তাদের প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে। এটি শুধুমাত্র কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত করবে না, বরং সমাজে লিঙ্গ সমতা এবং পারিবারিক দায়িত্বের প্রতি একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার এই উদ্যোগ অসমের সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি মানবিক এবং প্রগতিশীল পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেবে।