১৮০০ বছরের গুহায় মিলল ১৫০০ বছরের প্রাচীন গণেশ মূর্তি

ancient-ganesha-idol-found-nagarjuni-hills-bihar

বিহারের ঐতিহাসিক নাগার্জুনি পাহাড়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সময় এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার (ancient Ganesha) ঘিরে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। প্রায় ১,৮০০ বছরের পুরনো একটি প্রাচীন গুহার ভিতর থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ১,৫০০ বছরের পুরনো একটি গণেশ মূর্তি। প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞদের অনুমান, এই মূর্তিটি ষষ্ঠ শতাব্দীর, অর্থাৎ গুপ্ত যুগের শেষ পর্বের শিল্পকর্ম। ইতিমধ্যেই এই আবিষ্কারকে ঘিরে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও ধর্মীয় ঐতিহ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

Advertisements

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্নতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (ASI)-এর আধিকারিকরা জানিয়েছেন, বিহারের জেহানাবাদ জেলার নাগার্জুনি পাহাড়ে সম্প্রতি একটি সমীক্ষা চলাকালীন এই মূর্তিটির সন্ধান মেলে। পাহাড়ি অঞ্চলের ওই গুহাটি বহু শতাব্দী ধরে অজ্ঞাতই ছিল। গুহার অভ্যন্তরে পাথরের গায়ে খোদাই করা একটি সুস্পষ্ট গণেশ মূর্তি নজরে আসে গবেষকদের। পরে বিস্তারিত পরীক্ষা করে জানা যায়, মূর্তিটি প্রায় ১,৫০০ বছরের পুরনো এবং শৈল্পিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে গুপ্ত যুগের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

   

বর্তমানে উদ্ধার হওয়া মূর্তিটি পাটনা মিউজিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। সেখানে বিশেষজ্ঞদের একটি দল মূর্তিটির শিলালিপি, খোদাই কৌশল এবং ধর্মীয় প্রতীক বিশ্লেষণ করছেন। ASI সূত্রে খবর, মূর্তিটি একখণ্ড পাথরে খোদাই করা, যেখানে গণেশের চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য—হাতির মুখ, বক্র শুঁড়, স্থূল দেহ এবং শান্ত ভঙ্গি—স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। শিল্পরীতির দিক থেকে এটি উত্তর ভারতের প্রাচীন হিন্দু মূর্তিশিল্পের একটি উল্লেখযোগ্য নিদর্শন বলে মনে করা হচ্ছে।

নাগার্জুনি পাহাড় ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এটি বিখ্যাত বারাবর গুহাগুলির কাছেই অবস্থিত, যেগুলি মৌর্য যুগের বৌদ্ধ ও আজীবিক সন্ন্যাসীদের সঙ্গে যুক্ত। ইতিহাসবিদদের মতে, নাগার্জুনি ও বারাবর পাহাড় অঞ্চল প্রাচীন ভারতে ধর্মীয় সহাবস্থানের এক অনন্য উদাহরণ। একদিকে যেমন মৌর্য যুগের বৌদ্ধ ও আজীবিক স্থাপত্যের নিদর্শন রয়েছে, অন্যদিকে পরবর্তী গুপ্ত যুগে হিন্দু ধর্মীয় চর্চার ছাপও এখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সদ্য উদ্ধার হওয়া গণেশ মূর্তিটি সেই ধারাবাহিক ইতিহাসেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বলে মনে করা হচ্ছে।

এই আবিষ্কার নতুন করে প্রমাণ করছে যে, বিহারের ইতিহাস কেবল বৌদ্ধ ধর্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গুপ্ত যুগে হিন্দু ধর্মের নানা দেবদেবীর উপাসনাও এই অঞ্চলে সমানভাবে বিস্তৃত ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, গুহার ভিতরে গণেশ মূর্তি থাকার অর্থ হল, ওই স্থানটি কোনও এক সময় হিন্দু সাধক বা ভক্তদের উপাসনাস্থল হিসেবেও ব্যবহৃত হত।

তবে এই আবিষ্কার ঘিরে বিতর্কও শুরু হয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও বিভিন্ন মহলে প্রতিক্রিয়া বিভক্ত। একাংশ এই আবিষ্কারকে “হিন্দু গৌরবের প্রমাণ” হিসেবে দেখছেন এবং বিহারের প্রাচীন হিন্দু ঐতিহ্যের কথা তুলে ধরছেন। আবার অন্য একটি অংশের দাবি, এই ধরনের মূর্তি “পরবর্তীকালে স্থাপন করা হতে পারে” বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা চলছে। যদিও ASI আধিকারিকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই মূর্তির সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কোনও ধরনের কারসাজির প্রমাণ মেলেনি।

ইতিহাসবিদদের মতে, এই ধরনের আবিষ্কারকে রাজনৈতিক রঙ না দিয়ে, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দেখা জরুরি। কারণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি আসলে ভারতের বহুস্তরীয় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। নাগার্জুনি পাহাড়ের গুহায় পাওয়া গণেশ মূর্তি সেই জটিল ও সমৃদ্ধ অতীতেরই একটি অংশ।

আগামী দিনে এই গুহা ও আশপাশের এলাকায় আরও বিস্তৃত খনন ও গবেষণার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশা, এর ফলে বিহারের প্রাচীন ইতিহাসের আরও অজানা অধ্যায় সামনে আসবে। ১,৮০০ বছরের পুরনো গুহায় ১,৫০০ বছরের পুরনো গণেশ মূর্তির আবিষ্কার নিঃসন্দেহে ভারতের প্রত্নতাত্ত্বিক মানচিত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হয়ে থাকল।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements