অন্ধ্রপ্রদেশের পশ্চিম গোদাবরী জেলার নল্লাজেরলা গ্রামে ড. ভীম রাও আম্বেদকরের একটি মূর্তি (Ambedkar Statue) কিছু অজ্ঞাত ব্যক্তি দ্বারা ভাঙচুর করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। ঘটনার তীব্রতা উপলব্ধি করে মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু অবিলম্বে এই ভাঙচুরের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। অন্ধ্রপ্রদেশের শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা হরিশ কুমার গুপ্তা মুখ্যমন্ত্রী নাইডুকে এই ঘটনার বিস্তারিত প্রতিবেদন দিয়ে পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছেন।
ডিজিপি গুপ্তা মুখ্যমন্ত্রীকে আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই ঘটনার তদন্তের জন্য একটি বিশেষ পুলিশ দল গঠন করা হয়েছে এবং দোষীদের গ্রেফতার করতে সমস্ত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তিনি জানান, প্রাথমিক তদন্তে মনে হচ্ছে এটি একটি ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা, যার উদ্দেশ্য সম্প্রদায়গত উত্তেজনা সৃষ্টি করা। ডিজিপি গুপ্তা আরও বলেন, “যারা এই কাজে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজ্যে শান্তি ও সম্প্রীতি নষ্ট করার যে কোনও প্রয়াসকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।”
ঘটনার পটভূমি ও স্থানীয় প্রতিক্রিয়া
নল্লাজেরলা গ্রামে স্থাপিত ড. ভীম রাও আম্বেদকরের মূর্তিটি স্থানীয়দের কাছে গভীর শ্রদ্ধা ও গর্বের প্রতীক। আম্বেদকর, যিনি ভারতীয় সংবিধানের প্রধান শিল্পী হিসেবে পরিচিত, তাঁর সমাজ সংস্কার ও দলিতদের উন্নয়নের কাজের জন্য সারা দেশে সম্মানিত। এই মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা রাতের অন্ধকারে এই কাজটি করেছে, যা সকালে প্রকাশ্যে আসার পর গ্রামবাসীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
গ্রামের বাসিন্দারা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে দোষীদের শাস্তির দাবি তুলেছেন। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “এটি কেবল একটি মূর্তি নয়, আমাদের আত্মসম্মান ও বিশ্বাসের প্রতীক। যারা এই কাজ করেছে, তাদের কঠোর শাস্তি পাওয়া উচিত।” ঘটনার পর স্থানীয় নেতারা এবং সমাজকর্মীরাও এই ভাঙচুরের নিন্দা করে শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া ও তদন্তের নির্দেশ
মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নাইডু এই ঘটনাকে “অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, “ড. আম্বেদকরের মূর্তি ভাঙচুর একটি গর্হিত কাজ, যা আমাদের সমাজের মূল্যবোধের উপর আঘাত। আমি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছি এই ঘটনার পেছনের কারণ এবং দোষীদের দ্রুত চিহ্নিত করতে।” তিনি আরও আশ্বাস দিয়েছেন যে, এই ঘটনায় জড়িতদের কোনওভাবেই রেহাই দেওয়া হবে না।
মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশের পর পুলিশ তৎপরতার সঙ্গে তদন্ত শুরু করেছে। ডিজিপি গুপ্তা জানিয়েছেন, ঘটনাস্থল থেকে প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, “আমরা এই ঘটনাকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছি। এটি সম্প্রদায়গত উত্তেজনা সৃষ্টির একটি পরিকল্পিত চেষ্টা বলে মনে হচ্ছে। দোষীদের শীঘ্রই আইনের আওতায় আনা হবে।”
পুলিশের তৎপরতা ও শান্তি রক্ষার আহ্বান
ডিজিপি গুপ্তা স্থানীয়দের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, “আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। কেউ যদি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি জানান, নল্লাজেরলা গ্রামে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
পুলিশের একটি বিশেষ দল ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় তল্লাশি চালাচ্ছে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে তথ্য সংগ্রহ করছে। ডিজিপি আরও বলেন, “আমরা সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করার জন্য সব ধরনের প্রযুক্তিগত ও মানবিক সংস্থান ব্যবহার করছি। দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা হবে।”
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর রাজ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এবং সামাজিক সংগঠন তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিরোধী দল ওয়াইএসআর কংগ্রেস পার্টি (ওয়াইএসআরসিপি) এই ভাঙচুরকে “সরকারের ব্যর্থতা” হিসেবে চিহ্নিত করে বলেছে, “এটি প্রমাণ করে যে বর্তমান সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অক্ষম।” দলটির নেতা ওয়াই এস জগন মোহন রেড্ডি এই ঘটনার নিন্দা করে দোষীদের দ্রুত শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিভিন্ন দলিত সংগঠন এই ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। তারা বলছে, “এটি কেবল একটি মূর্তির উপর আক্রমণ নয়, আম্বেদকরের আদর্শ এবং দলিত সম্প্রদায়ের সম্মানের উপর আঘাত।” তারা সরকারের কাছে এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তির দাবি তুলেছে।
নল্লাজেরলা গ্রামে ড. আম্বেদকরের মূর্তি ভাঙচুরের ঘটনা অন্ধ্রপ্রদেশে বড় ধরনের বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল একটি অপরাধ নয়, সমাজের শান্তি ও সম্প্রীতির উপর আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী নাইডু এবং পুলিশের তৎপরতা এই ঘটনার গুরুত্ব তুলে ধরছে। তদন্তের ফলাফল এবং দোষীদের শাস্তি কীভাবে নিশ্চিত করা হয়, তা আগামী দিনে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর প্রভাব ফেলবে। এই ঘটনা আম্বেদকরের আদর্শের প্রতি শ্রদ্ধা এবং সমাজে শান্তি বজায় রাখার গুরুত্বকে আরও একবার সামনে এনেছে।