
শান্তিনগরের যে জায়গায় বাঙালি পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানা শুধুমাত্র বাঙালি হওয়ার অপরাধে নির্মমভাবে খুন হয়েছিলেন, সেই এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শন করলেন অধীর রঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury)। তাঁর মতে, এক ভয়াবহ বাস্তবতার মুখোমুখি হলাম। ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে, স্থানীয় কয়েকজন মানুষের সঙ্গে কথা বলে বারবার মনে হয়েছে—মানুষ কতটা উগ্র, কতটা অমানবিক হলে ভাষা ও পরিচয়ের মতো বিষয়কে কেন্দ্র করে একজন নিরীহ শ্রমিককে হত্যা করতে পারে!
এই হত্যাকাণ্ড কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা ঘৃণা, বিদ্বেষ এবং অসহিষ্ণুতার বহিঃপ্রকাশ। জুয়েল রানা ছিলেন একজন পরিযায়ী শ্রমিক—নিজের পরিবার, সংসার এবং জীবিকার টানে ভিনরাজ্যে কাজ করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে তিনি নিরাপত্তা পাননি। তাঁর একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল—তিনি বাঙালি, তাঁর ভাষা আলাদা, তাঁর পরিচয় আলাদা।
ঘটনাস্থলে কথা বলা স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই এই বর্বর ঘটনার নিন্দা করেছেন। তাঁদের অনেকের চোখেমুখেই লজ্জা ও ক্ষোভ স্পষ্ট। প্রশাসনের একাংশও ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—এই আশ্বাস কি যথেষ্ট? একজন মানুষকে শুধুমাত্র ভাষার কারণে প্রাণ দিতে হলে, তা কি শুধু আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতা, না কি তার চেয়েও বড় সামাজিক ব্যর্থতা?
ভারতবর্ষের মূল শক্তি তার বৈচিত্র্যে। ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, বিশ্বাস—সব মিলিয়েই এই দেশের পরিচয়। সেই বৈচিত্র্যই আমাদের গণতন্ত্রকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু যখন সেই বৈচিত্র্যকে ঘৃণার চোখে দেখা হয়, যখন পরিচয়কে অস্ত্র করে হিংসা ছড়ানো হয়, তখন ভারতের আত্মাই ক্ষতবিক্ষত হয়।
জুয়েল রানার হত্যাকাণ্ড আমাদের মনে করিয়ে দেয়, পরিযায়ী শ্রমিকরা কতটা অসুরক্ষিত। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে গিয়ে কাজ করা মানুষগুলো উন্নয়নের চাকা ঘোরালেও, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা কতটা উদাসীন—এই প্রশ্ন আজ আরও জোরালোভাবে উঠে আসছে। ভাষাগত বিদ্বেষ, আঞ্চলিক উগ্রতা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ এই ধরনের ঘটনার জন্য উর্বর জমি তৈরি করছে।
এই হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারের সর্বনাশ নয়, এটি সমাজের বিবেকের উপরও এক গভীর আঘাত। গণতন্ত্রে প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার থাকার কথা। সেখানে যদি ভাষা বা পরিচয়ের কারণে কাউকে টার্গেট করা হয়, তবে সেই গণতন্ত্র অর্থহীন হয়ে পড়ে। প্রশ্ন ওঠে—আমরা কোন পথে এগোচ্ছি? ঘৃণা আর বিভাজনের পথে, না কি সহাবস্থান ও মানবিকতার পথে?
এই ঘটনার কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া জরুরি। শুধু দোষীদের শাস্তি দিলেই চলবে না, সমাজে যে ঘৃণার রাজনীতি ও বিদ্বেষের সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, তার বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়াতে হবে। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ—সকলেরই দায়িত্ব এই ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করা।
জুয়েল রানার মৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মানবিকতা কোনও বিকল্প নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের শর্ত। ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের বৈচিত্র্যকে সম্মান করাই ভারতের প্রকৃত শক্তি। সেই শক্তিকে ধ্বংস করে কোনও সমাজ এগোতে পারে না। এই বর্বর হত্যাকাণ্ড যেন আমাদের ঘুম ভাঙায় এবং আমরা আবারও মানবিক, সহনশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভারতের পথে ফিরে আসি—এই কামনাই আজ সবচেয়ে জরুরি।









