Home Offbeat News বিশ্বে বন্দিত: দেশে বিস্মৃত ভারতের প্রথম কম্পিউটার এই বাঙালি

বিশ্বে বন্দিত: দেশে বিস্মৃত ভারতের প্রথম কম্পিউটার এই বাঙালি

samarendra-K-maitra

বিশেষ প্রতিবেদন: কম্পিউটার ছাড়া এখন দিন অচল। ‘টেক-স্যাভি’ জেনারেশনের কাছে চার্লস ব্যাবেজ, স্টিভ জোবস্ বা বিল গেটস্‌-এঁরাই ভগবানতুল্য। ভাগ্যিস এই আবিস্কার হয়েছিল, না হলে কে জানে কি হত! কিন্তু কতজন জানেন, ভারতের প্রথম কম্পিউটার নির্মাতা এক বাঙালি। তিনি বৈজ্ঞানিক সমরেন্দ্র কুমার মিত্রকে।

- Advertisement -

সমরেন্দ্র মিত্র কলকাতার ‘কম্পিউটিং মেশিন ও ইলেক্ট্রনিক্স’ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রথম বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। ১৯৫৪ সালে ভারতের প্রথম দেশীয় ইলেক্ট্রনিক অ্যানালগ কম্পিউটারটির নক্সা তৈরি ও নির্মাণের কাজ করেছিলেন। তাঁর তৈরি সেই কম্পিউটার ১০টি চলরাশিযুক্ত সরল সমীকরণ ও তৎসংক্রান্ত গণনার কাজ অনায়াসেই করতে পারত এবং এতে ‘গাউস-সেইডেল পুনরাবৃত্তি প্রক্রিয়া’র একটি পরিবর্তিত সংস্করণের প্রয়োগ করা হয়েছিল। বউবাজার হাইস্কুল ও প্রেসিডেন্সি কলেজের এই প্রাক্তনীর নেতৃত্বে ১৯৬৩ সালে আইএসআই ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ প্রচেষ্টায় ভারতের প্রথম দ্বিতীয়-জেনারেশন দেশীয় ডিজিটাল কম্পিউটার তৈরির কাজ শুরু হয়। এই যন্ত্রের নক্সা ও নির্মাণের কাজ করেছিলেন সমরেন্দ্রবাবু নিজে। ট্রানজিস্টর-মাধ্যমে তৈরি এই কম্পিউটারটির নাম রাখা হয়েছিল ‘আইএসআইজেউ-১’ এবং এই কম্পিউটারটি কার্যকরী হয় ১৯৬৪ সালে।

   

samarendra-K-maitra

সমরেন্দ্র কুমার মিত্র ছিলেন একজন স্বশিক্ষিত স্কলার। তাঁর আগ্রহের পরিধি ব্যাপৃত ছিল গণিত, ফিজিক্স, রসায়ন, প্রাণীবিদ্যা, পোল্ট্রি-বিজ্ঞান, সংস্কৃত, দর্শন, ধর্ম, সাহিত্য ইত্যাদি নানা বিষয়ে। ১৯৩৫ সালে রসায়নের জন্য তাঁকে কানিংহ্যাম পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৭-এ রসায়নে ও ১৯৪০-এ ফলিত গণিত বিষয়ে তিনি এম.এসসি ডিগ্রি লাভ করেন। কিছু বছর পর মেঘনাদ সাহার তত্ত্বাবধানে ফিজিক্সে পিএইচডি করতে শুরু করলেও ১৯৫৬-এ মেঘনাদ সাহার প্রয়াণের পর সেই কাজ থেকে তিনি সরে আসেন।

সমরেন্দ্রবাবু ১৯৪৪ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত সিএসআইআর-এর তত্ত্বাবধানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পালিত ফিজিক্স ল্যাবরেটরিতে রিসার্চ ফিজিসিস্ট-রূপে ‘এয়ার-ড্রিভেন আল্ট্রাসেন্ট্রিফিউজ’-এর নক্সা ও গঠন নিয়ে কাজ করেছিলেন। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের উচ্চগতির কম্পিউটিং মেশিন বিষয়ে শিক্ষালাভের জন্য তাঁকে ইউনেস্কো কর্তৃক স্পেশাল ফেলোশিপ প্রদান করা হয় ১৯৪৯-৫০ সালে এবং তিনি সেইসময় হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্সটনের ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্স স্টাডিজ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাথামেটিক্যাল ল্যাবরেটরিতে কাজ করেছেন। প্রিন্সটনে কর্মরত থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে আইনস্টাইন, উলফগ্যাং পাউলি, জন ভন নিউম্যান প্রমুখ ফিজিসিস্ট ও গণিতজ্ঞদের পরিচয় হয়। পাশাপাশি বিজ্ঞানী নীলস্‌ বোর ও রবার্ট ওপেনহাইমারের প্রচুর বক্তৃতায় তিনি আমন্ত্রিত ছিলেন।

samarendra-K-maitra

১৯৫০ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তিনি আইএসআই-তে বিভিন্ন পদে কাজ করেছেন – কখনও অধ্যাপক, কখনও ডিরেক্টর হিসেবে। তিনি ইউনাইটেড নেশন্স টেকনিক্যাল অ্যাসিস্টেন্স অ্যাডমিনিস্ট্রেশন-এর অ্যাডভাইজার হিসেবে কাজ করেছেন এবং ১৯৫৫ সালে তাঁর নেতৃত্বেই তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া থেকে ১ কোটি টাকার এক বিরাট ‘টেকনিক্যাল-এইড’ ভারতে এসেছিল।

সারাজীবনে সমরেন্দ্র মিত্র অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ছিলেন, সেগুলির মধ্যে ১৯৫৯ সালে ‘ব্যালেস্টিক ট্রাজেক্ট্রি’ বিষয়ে ভারত সরকারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের উপদেষ্টার পদ, ১৯৬২-৬৪ সালে ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কমিটি ফর স্পেস রিসার্চ’-এর সদস্যপদ এবং ১৯৬৯-৭৬ সালে ভারত সরকারের ‘ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন’-এর টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারের পদ অন্যতম। তিনি ‘ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কাল্টিভেশন অফ সায়েন্স’ ও আমেরিকার ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর কম্পিউটিং মেশিনারি’ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের সদস্য ছিলেন। ‘এন.আর সেন্টার ফর পেডাগজিক্যাল ম্যাথামেটিক্স’-এ প্রফেসর এবং ‘ক্যালকাটা ম্যাথামেটিক্যাল সোসাইটি’র চেয়ারম্যান এবং এমেরিটাস প্রফেসরও ছিলেন সমরেন্দ্র কুমার মিত্র। গণিত, থিওরেটিক্যাল ফিজিক্স ও কম্পিউটার বিজ্ঞান বিষয়ে তাঁর প্রচুর গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল।

সমরেন্দ্রবাবু ভারত সরকারের নানাবিধ রিসার্চ ও ডেভেলপমেন্ট কমিটির গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৬৫ সালে ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউটে আয়োজিত ‘কম্পিউটার সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া’র প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের বাস্তবায়নের পিছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ-এ যেখানে গুগল, মাইক্রোসফটের মত আজকের বিশ্বের তাবড় তাবড় টেক-জায়ান্ট সংস্থার মুখ্য কার্যালয়, সেখানেই ‘কম্পিউটার হিস্ট্রি মিউজিয়াম’-এ রয়েছে সমরেন্দ্র মিত্রের নামে স্মৃতিফলক। দুনিয়া যাঁকে স্বীকৃতি দিয়েছে, বাঙালি তাঁকে ভুলে গিয়েছে।

Follow on Google