হিন্দি নয়, স্কুল-কলেজে দক্ষিণ ভারতের ভাষা শেখাবে যোগী সরকার!

yogi-government-tamil-language-schools-colleges-uttar-pradesh

উত্তরপ্রদেশে শিক্ষা ও ভাষানীতিকে ঘিরে নতুন করে বিতর্ক ও আগ্রহের জন্ম দিয়েছে যোগী আদিত্যনাথ (Yogi Adityanath) সরকারের এক অভিনব উদ্যোগ। ‘হিন্দি চাপিয়ে দেওয়া’ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক বিতর্ক চলে আসছে, তার মধ্যেই এবার হিন্দির বদলে স্কুল-কলেজে দক্ষিণ ভারতের ভাষা শেখানোর পথে হাঁটতে চলেছে যোগী সরকার। বিশেষ করে বারাণসীর স্কুল ও কলেজগুলিতে নিয়মিত তামিল ভাষা শিক্ষা চালু করার পরিকল্পনা সামনে এসেছে। এই উদ্যোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ‘কাশী তামিল সংগমম’—একটি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক প্রকল্প, যা উত্তর ও দক্ষিণ ভারতের প্রাচীন ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগসূত্রকে নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।

Advertisements

সূত্রের খবর, উত্তরপ্রদেশ সরকারের এই পরিকল্পনার অনুপ্রেরণা এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ডিসেম্বর ২০২৫-এ ‘মন কি বাত’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক বক্তব্য থেকে। সেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বারাণসীর এক ছাত্রের উদাহরণ তুলে ধরেন, যে অল্প সময়ের মধ্যেই তামিল ভাষার প্রাথমিক জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার পরেই রাজ্য সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখে এবং পরীক্ষামূলক ভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় তামিল ভাষা অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়।

   

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসেই বারাণসীতে একটি পাইলট প্রকল্প চালু হয়েছিল। ওই প্রকল্পে মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে প্রায় ১,৫০০ পড়ুয়াকে তামিল ভাষার প্রাথমিক শব্দভান্ডার, বাক্যগঠন ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট শেখানো হয়। শিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকদের দাবি, পড়ুয়াদের মধ্যে উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো এবং অনেকেই ভবিষ্যতে আরও গভীরভাবে তামিল ভাষা শেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এই সাফল্যের পরই সরকার নিয়মিত পাঠক্রমের মাধ্যমে তামিল শেখানোর রূপরেখা তৈরি করছে।

‘কাশী তামিল সংগমম’ প্রকল্পটি প্রথম চালু হয় ২০২২ সালে, ভারতের শিক্ষা মন্ত্রকের উদ্যোগে। এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল কাশী (বারাণসী) ও তামিলনাড়ুর মধ্যে প্রাচীন সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও বৌদ্ধিক সম্পর্ককে উদযাপন করা। ইতিহাসবিদদের মতে, বহু শতাব্দী আগে থেকেই এই দুই অঞ্চলের মধ্যে জ্ঞান, দর্শন ও ভাষার আদানপ্রদান হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে অনুষ্ঠিত ‘কাশী তামিল সংগমম’-এর চতুর্থ সংস্করণে বিশেষ ভাবে তামিল ভাষা শিক্ষার উপর জোর দেওয়া হয়। সেখানে ছাত্র বিনিময় কর্মসূচি, ভাষা কর্মশালা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়, যা দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

সরকারি মহলের দাবি, এই উদ্যোগ কেবল তামিল ভাষা শেখানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং ধাপে ধাপে ভারতের ২২টি সরকারি ভাষা সম্পর্কে পড়ুয়াদের সচেতন করার একটি বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ এটি। শিক্ষাবিদদের একাংশ মনে করছেন, বহুভাষিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছাত্রছাত্রীদের মানসিক বিকাশ, স্মৃতিশক্তি ও সামাজিক সহনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করে। বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, একাধিক ভাষা শেখার ফলে শিশুদের সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা ও সাংস্কৃতিক বোঝাপড়া উন্নত হয়।

তবে এই উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্নও উঠছে। সোশ্যাল মিডিয়া ও রাজনৈতিক মহলে কেউ কেউ একে ‘প্রতীকী উদ্যোগ’ বলে কটাক্ষ করছেন। তাঁদের বক্তব্য, পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত শিক্ষক, পাঠ্যপুস্তক ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই ধরনের ভাষা শিক্ষা কার্যকর হবে না। অনেক অভিভাবকও জানতে চাইছেন, অতিরিক্ত ভাষা শেখানোর চাপ পড়ুয়াদের উপর কতটা পড়বে এবং বাস্তবে তার ব্যবহারিক মূল্য কতখানি।

এদিকে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া হচ্ছে না। তামিলনাড়ু থেকে ভাষা বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষক এনে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ডিজিটাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন কোর্সের মাধ্যমেও পড়ুয়াদের সহায়তা করা হবে।

সব মিলিয়ে, হিন্দির বদলে দক্ষিণ ভারতের ভাষা শেখানোর এই সিদ্ধান্ত উত্তরপ্রদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চলেছে বলেই মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। এটি সত্যিই জাতীয় সংহতি ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের সেতু হয়ে উঠবে, নাকি কেবল রাজনৈতিক বার্তাবাহী এক প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে—তার উত্তর দেবে সময়ই।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন
Advertisements