নতুন ভারতীয় কর্মসংস্থানের ইতিহাস রচনা করতে চলেছে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি খাত- কারণ আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি সংস্থাগুলি (Tech Giants) আগামী বছরেও হাজার হাজার ভারতীয়কে কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে প্রস্তুত (US tech companies)। ২০২৫ সালে Meta, Amazon, Apple, Microsoft, Netflix ও Google-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতে মাত্র এক বছরে ৩২,০০০-এরও বেশি নতুন কর্মী নিয়োগ করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮ শতাংশ বৃদ্ধি নির্দেশ করে এবং মোট কর্মীসংখ্যা পৌঁছেছে প্রায় ২,১৪,০০০-এ।
এই সংখ্যা শুধু রোবটিক্যাল বা সাধারণ কাজ নয় — অনেকটাই বিশেষায়িত প্রযুক্তি দক্ষতার উপর ভিত্তি করে। এদের মধ্যে AI/ML অপারেশন, ডেটা ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবারসিকিউরিটি এবং উন্নত প্রযুক্তি নেটওয়ার্কিং— এসব ক্ষেত্রে দক্ষতা থাকা সেই কাজগুলোতে আবেদন করা হচ্ছে প্রধানত।
কেন এই বিশাল কর্মসংস্থান বৃদ্ধি?
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও পরবর্তী প্রজন্মের প্রযুক্তিগুলোর চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এই কোম্পানিগুলোতে বিশেষজ্ঞদের প্রয়োজন বাড়ছে। যদিও আমেরিকায় H-1B ভিসা নীতিগুলো কঠোর হয়ে উঠেছে, যার মধ্যে আছে $100,000 ফি, বেতনভিত্তিক লটারির মতো নতুন নিয়ম, এবং আন্তর্জাতিক কর্মী নিয়োগে সীমাবদ্ধতা — তবুও ভারত তাদের জন্য মূল্যের দিক থেকে অত্যন্ত উপযোগী কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এই বিধিনিষেধগুলির কারণে অনেক বড় সংস্থা তাদের কর্মীর নিয়োগ ও উৎপাদন কার্যক্রম ভারতে ভিত্তি করে বহুমাত্রিকভাবে সম্প্রসারণ করছে — ফলে ভারতে কর্মসংস্থানের সুযোগ বেড়েছে যেখানে দক্ষ ট্যালেন্টের প্রয়োজনে বিশ্বব্যাপী প্রতিযোগিতা চলছে।
বড় বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা
শুধু কর্মী নিয়োগেই থেমে নেই; ভারতকে ভবিষ্যতের প্রযুক্তি হাবে পরিণত করতে বড় বড় বিনিয়োগও ঘোষণা করা হয়েছে:
- Google ঘোষণা করেছে বেসরকারি প্রকল্প হিসেবে ১৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ একটি বড় AI হাব তৈরির জন্য যা ভবিষ্যতে পুনর্ব্যক্তি করে ১,০০,০০০+ কাজ সৃষ্টি করবে।
- Microsoft ভারতে তার ক্লাউড ও AI অবকাঠামো সম্প্রসারণে ১৭.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে।
- Amazon ২০৩০ পর্যন্ত ভারতে প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ করবে এবং এক মিলিয়নেরও বেশি অতিরিক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা দিয়েছে।
এই বিনিয়োগগুলোর উদ্দেশ্য শুধু স্বল্পমেয়াদি নিয়োগ নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী প্রযুক্তিগত ভিত্তি গঠন এবং দক্ষতা উন্নয়ন। এতে শুধু কর্মসংস্থানই বৃদ্ধি পাবে না, বরং ইকোসিস্টেমের মধ্যে দক্ষ কর্মীদের মূল্যও বেড়ে যাবে।
ভবিষ্যতের চাকরি প্রবণতা
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ২০২৬ সালে এই নিয়োগের প্রবণতা আরও ১৬-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে তা সাধারণ নিয়োগ নয়, বরং অনলাইন সেবা, AI-ভিত্তিক পণ্য উন্নয়ন, সফটওয়্যার নিরাপত্তা, ডেটা সায়েন্স ও ক্লাউড প্ল্যাটফর্মের মতো উন্নত প্রযুক্তি ক্ষেত্রগুলিতে বেশি হবে।
এছাড়াও, বর্তমানে অনেক প্রতিষ্ঠান ভারতকে শুধু একটি অধঃস্থিতি কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী তাদের প্রধান গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্রের একটি অংশ হিসেবে গড়ে তুলছে। এর ফলে শুধু প্রযুক্তিগত কাজ নয়, নেতৃত্বের ভূমিকায়ও ভারতীয় কর্মীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
ভারতীয় প্রযুক্তি ট্যালেন্টের শক্তি
ভারত আজ বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী প্রযুক্তি শ্রমবাজার হিসেবে স্বীকৃত। গ্লোবাল স্তরে বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় ট্যালেন্টে বিনিয়োগ করছে কারণ এখানকার ইঞ্জিনিয়ারিং, সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সলিউশনে দক্ষতা অত্যন্ত উন্নত।
এতে শুধু তথ্যপ্রযুক্তি ক্ষেত্র নয়, সাইবারসিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালাইটিক্স, AI/ML গবেষণা—সব ক্ষেত্রেই ভারতীয় পেশাজীবীদের চাহিদা বাড়ছে। আর এই নিয়োগগুলো শুধু প্রযুক্তি কর্মী নয় বরং আন্তর্জাতিক মানের গবেষক, ডিজাইনার ও গবেষণা বিশ্লেষক হিসেবেও কাজের দরজা খুলে দিচ্ছে।
২০২৫ সালের শেষে দেখা গেল বিশ্বের শীর্ষ প্রায় সব প্রযুক্তি কোম্পানি ভারতকে তাদের কর্মী নিয়োগে অগ্রাধিকার দিচ্ছে, এবং এই প্রবণতা ২০২৬ ও তার পরের বছরগুলোতে আরও দৃঢ় হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই নতুন কর্মসংস্থান শুধু চাকরি সংখ্যা বাড়াচ্ছে না, বরং ভারতকে একটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতেও সহায়তা করছে। এই পরিবর্তন ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতি ও দক্ষ কর্মসংস্থান-এর পথে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হচ্ছে।


