বেলডাঙ্গায় এক বেসরকারি টিভি চ্যানেলের মহিলা সাংবাদিককে প্রকাশ্যে মারধর করার ঘটনাটি আর একটি অপরাধ হিসেবে দেখা গেলে ভুল হবে। এটি আসলে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ (Press freedom in Bengal) কোথায় দাঁড়িয়ে আছে, তার একটি জীবন্ত নথি। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলে যাকে আমরা বইয়ে পড়েছি, বাস্তবে সেই স্তম্ভটি আজ লাঠির আঘাতে নড়বড়ে হয়ে পড়ছে, আর প্রশাসন দূর থেকে সেটার কাঠামোগত ব্যাখ্যা দিচ্ছে।
এই রাজ্যে এখন সাংবাদিক হওয়া মানে শুধু প্রশ্ন তোলা নয়, বরং আগে হিসেব কষে নেওয়া, আজ কোন দিন কোন এলাকা কোন আবহে কথা বলা নিরাপদ। ক্যালেন্ডার দেখে নিরাপত্তা বিচার করার এই নতুন রাজনৈতিক দর্শন আসলে প্রশাসনিক আত্মবিশ্বাসের এক অদ্ভুত রূপ। রাষ্ট্র যেন বলছে আইন আছে, পুলিশ আছে, সংবিধান আছে, কিন্তু কিছু দিনে সেগুলো একটু সাবধানে ব্যবহার করতে হয়। নাগরিকদেরও তাই সাবধানে থাকতে হয়।
Read More: ফাইলের অন্তরালেই রাজনীতি!
এই সতর্কতার তত্ত্ব এখানেই থেমে থাকে না। এটি ধীরে ধীরে একটি সামাজিক বার্তা তৈরি করে, সব নাগরিক সমান নন, সব দিন সমান নয়, এবং সব অপরাধের প্রতিক্রিয়াও সমান হওয়ার প্রয়োজন নেই। এর ফলেই সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে হিন্দু নাগরিকদের মধ্যে এক অস্বস্তিকর প্রশ্ন জন্ম নিচ্ছে। তাহলে কি তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপনও আজ রাজনৈতিক ভারসাম্যের শর্তসাপেক্ষ?
গবেষণার চোখে তাকালে দেখা যায়, এই প্রশ্ন কোনও হঠকারী আবেগ থেকে আসেনি। পশ্চিমবঙ্গে গত এক দশকে একাধিক ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট এলাকায় বা নির্দিষ্ট সময়ে প্রশাসনের আচরণ হয়ে উঠেছে অস্বাভাবিকভাবে নরম, প্রায় ব্যাখ্যাপ্রবণ। আইনশৃঙ্খলা যেন সেখানে প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং পরিস্থিতি বোঝার বিষয়। দোষী খোঁজার বদলে ব্যাখ্যা খোঁজা হয়েছে বেশি। আর ব্যাখ্যার রাজনীতি যত বেড়েছে, ততই সাহস বেড়েছে রাস্তায়।
এই প্রবণতাকে আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যায় সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলির দিকে তাকালে। ২০১৬ সালের ধুলাগড়ের সাম্প্রদায়িক অশান্তি, ২০১৯ এবং ২০২১ পরবর্তী রাজনৈতিক সহিংসতা, ভাঙড় ও ক্যানিং অঞ্চলে বারবার প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নিন্দা ছিল, কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির ছিল সীমিত। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর রাজ্যের রাজনৈতিক হিংসা নিয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ ছিল যে সাংবাদিকদের কাজ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং প্রশাসনিক সুরক্ষা ছিল অপর্যাপ্ত। সেই রিপোর্ট রাজ্য সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে খারিজ করলেও, বাস্তবে সাংবাদিক নির্যাতনের ধারাবাহিকতা থামেনি। এই সময়েই সংখ্যালঘু ভোটব্যাঙ্ককে রাজনৈতিকভাবে সংহত রাখার কৌশল প্রশাসনিক আচরণে এমন এক নরমতা তৈরি করেছে, যা আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে দেশের একাধিক রাজ্যে একই সময়ে সাংবাদিক আক্রান্ত হলে দ্রুত গ্রেফতার এবং চার্জশিটের মাধ্যমে প্রশাসন কঠোর বার্তা দিয়েছে, যা পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে তুলনামূলকভাবে অনুপস্থিত।
Read More: বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি
এই প্রেক্ষাপটে একজন মহিলা সাংবাদিকের উপর হামলা শুধু পেশাগত ঝুঁকির গল্প নয়। এটি নারী নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার একসঙ্গে ব্যর্থতার গল্প। প্রশ্ন জাগে, যদি একজন ক্যামেরা হাতে থাকা মহিলা নিরাপদ না হন, তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা কল্পনাপ্রসূত?
অন্য রাজ্যগুলির দিকে তাকালে এই ব্যঙ্গ আরও স্পষ্ট হয়। সেখানে সাংবাদিক আক্রান্ত হলে প্রশাসন প্রথমে ক্যালেন্ডার নয়, আইনের বই খুলে। সেখানে ব্যাখ্যা নয়, গ্রেফতার হয়। আর এখানে ঘটনাকে ঘিরে সহানুভূতি থাকে, নিন্দা থাকে, কিন্তু তার সঙ্গে অদ্ভুতভাবে জুড়ে যায় সমাজতাত্ত্বিক সতর্কবাণী, যেন অপরাধ নয়, পরিস্থিতিই মূল অভিযুক্ত।
এই ব্যঙ্গাত্মক বাস্তবতাই আজ পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। যখন শাসনব্যবস্থা নিজেই ইঙ্গিত দেয় যে কিছু সময়ে আইন পুরোপুরি কার্যকর নাও থাকতে পারে, তখন দুষ্কৃতীদের আর আলাদা করে উৎসাহ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তারা বুঝে যায় সব কাজের জন্য শাস্তি আসে না, কিছু কাজ কেবল ব্যাখ্যা পায়।
বেলডাঙ্গার ঘটনায় তাই ক্ষতিগ্রস্ত শুধু একজন সাংবাদিক নন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাংবাদিকতার বিশ্বাসযোগ্যতা, নাগরিক নিরাপত্তার ধারণা এবং আইনের সমতার নীতি। গণতন্ত্রে রাষ্ট্র নাগরিককে সাবধান থাকতে বলে না, রাষ্ট্র নাগরিককে নিরাপদ রাখে। এই মৌলিক সত্য যতদিন ব্যাখ্যার নিচে চাপা থাকবে, ততদিন পশ্চিমবঙ্গের সাংবাদিকতা কেবল খবর সংগ্রহ করবে না, নিজের অস্তিত্বও রক্ষা করার লড়াই চালিয়ে যাবে।


