
বছরের শেষ দিনটা হিসেবের দিন। শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর নয়, সময়, অভিজ্ঞতা আর বাস্তবতার হিসেব কষার দিন। ২০২৫-এর শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে যখন আমি আমার পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) দিকে তাকাই, তখন কোনও একক ছবি চোখে পড়ে না। একসাথে বহু স্তরের বাস্তবতা ধরা দেয়। আশা আর ক্লান্তি পাশাপাশি হাঁটে। সম্ভাবনার পাশে দাঁড়িয়ে থাকে অপচয়ের দীর্ঘ ছায়া।
২০১১ সালের পর থেকে পশ্চিমবঙ্গ যেন এক অদ্ভুত যাত্রাপথে হাঁটতে শুরু করে। বাইরে থেকে দেখলে রঙিন পোস্টার আছে, উৎসবের আলো আছে, নানা প্রকল্পের নাম আছে। শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে সাফল্যের ভাষা, মাইকে মাইকে উন্নয়নের গল্প। কিন্তু একটু গভীরে গেলে যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তা অনেক বেশি নীরব, অনেক বেশি জটিল, আর অনেক বেশি প্রশ্নবিদ্ধ।
২০২৫-এর শেষ দিনে দাঁড়িয়ে আমি যখন এই রাজ্যকে দেখি, তখন বুঝি পশ্চিমবঙ্গ ভেঙে পড়েনি। দৈনন্দিন জীবন চলছে, বাজার খুলছে, স্কুলে ঘণ্টা পড়ছে, উৎসবে মানুষ ভিড় করছে। কিন্তু এটাও সত্য যে রাজ্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী এগোতে পারেনি। পশ্চিমবঙ্গ যেন এক দীর্ঘ মাঝপথে দাঁড়িয়ে থাকা সময়ের ভেতর দিয়ে চলেছে। গতি আছে, কিন্তু দিশা স্পষ্ট নয়। এগোনোর ইচ্ছা আছে, কিন্তু সাহস আর আস্থার অভাব চোখে পড়ে।
সবচেয়ে স্পষ্ট যে বিষয়টা সামনে আসে, তা হল জীবিকার প্রশ্ন। এই রাজ্যে মানুষ এখনও পরিশ্রম করে, কাজ করতে চায়, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চায়। তবু কাজের খোঁজে তাকাতে হয় রাজ্যের বাইরে। ট্রেনের প্ল্যাটফর্মে দাঁড়ালে বোঝা যায়, এই যাত্রা কোনও আনন্দের ভ্রমণ নয়, এটা প্রয়োজনের যাত্রা। তরুণ মুখগুলো ব্যাঙ্গালোর, কেরালা, দিল্লি বা মুম্বইয়ের দিকে যায়। রাজ্যে থেকে যায় বাবা-মা, শিকড়, আর স্মৃতি। টাকা ফিরে আসে, মানুষ ফিরে আসে না। ঘর চলে, কিন্তু সমাজ শক্ত হয় না। রাজ্যের অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাই বড় বড় সংখ্যায় নয়, মানুষের অনুপস্থিতিতে ধরা পড়ে।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই দ্বন্দ্ব। স্কুল আছে, কলেজ আছে, ডিগ্রি দেওয়া হয়। কিন্তু শিক্ষার সঙ্গে জীবনের যোগটা ক্রমশ আলগা হয়ে গেছে। বহু ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা শেষ করেই ধরে নেয়, এখানে ভবিষ্যৎ গড়া কঠিন। ফলে শিক্ষা আর স্বপ্নের সিঁড়ি থাকে না, অন্য কোথাও যাওয়ার টিকিটে পরিণত হয়। এই মানসিক বিচ্ছেদটাই সবচেয়ে বড় ক্ষতি করেছে। কারণ একবার যদি বিশ্বাস ভেঙে যায় যে যোগ্যতা নিজস্ব মাটিতে মূল্য পাবে না , তাহলে সেই সমাজ ধীরে ধীরে সম্ভাবনা তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। তখন সে শুধু সনদ তৈরি করে, ভবিষ্যৎ নয়।
স্বাস্থ্যব্যবস্থার ছবিটাও তেমনই দ্বৈত। প্রাথমিক স্তরে স্বস্তি আছে, পরিষেবা আছে, নাম আছে। কিন্তু জটিল রোগের সময় মানুষ নিজের রাজ্যের ওপর পুরোপুরি ভরসা করতে পারে না। তখন ঠিকানা বদলায়, ভেলোর, চেন্নাই, হায়দরাবাদ। এই অভ্যাসটাই সবচেয়ে চিন্তার। কারণ এতে বোঝা যায়, ব্যবস্থা উপস্থিত থাকলেও সক্ষমতা নিয়ে আস্থা তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এই বাস্তবতা চলতে চলতে এখন সেটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আর যেটা স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।
সমাজের ভেতরের বাতাসটাও বদলেছে। আজকের পশ্চিমবঙ্গে মানুষ কম কথা বলে, বেশি হিসেব করে। কে কোথায় কী বলছে, কার সামনে বলছে, এসব ভাবনা দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে। এই সতর্কতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। এসেছে অভিজ্ঞতা থেকে, ছোট ছোট ঘটনায় জমে ওঠা উপলব্ধি থেকে। আইন আছে, প্রশাসন আছে, কিন্তু নিশ্চিততার অভাব মানুষকে নীরব করে দিয়েছে। আর যখন নীরবতা অভ্যাসে পরিণত হয়, তখন সমাজ ধীরে ধীরে ভেতর থেকে শক্তি হারাতে থাকে।
এই সময়ে সহায়তা ও সুবিধা বহু ঘরে পৌঁছেছে, সেটা বাস্তব। কিন্তু সেই সহায়তার সঙ্গে আত্মনির্ভরতার পথটা সমানতালে তৈরি হয়নি। ফলে মানুষ টিকে আছে, কিন্তু দাঁড়াচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষয় নয়, মানসিক ক্ষয়ও তৈরি করে। মানুষ তখন নিজের ক্ষমতার ওপর ভরসা না রেখে পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে শেখে। সমাজে এক ধরনের স্থবিরতা জন্ম নেয়।
সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও এক অদ্ভুত বৈপরীত্য দেখা যায়। উৎসব আছে, ভিড় আছে, আলো আছে। কিন্তু যুক্তি, প্রশ্ন আর মতভেদের যে প্রাণচাঞ্চল্য একদিন এই মাটির পরিচয় ছিল, তা আগের মতো স্বতঃস্ফূর্ত নয়। অনেক সময় মনে হয়, চুপ থাকাই নিরাপদ। অথচ ইতিহাস বলে, পশ্চিমবঙ্গ কখনও নীরবতার রাজ্য ছিল না। সে প্রশ্ন করেছে, তর্ক করেছে, নতুন পথ খুঁজেছে। আজ সেই সাহসটা যেন একটু আড়ালে চলে গেছে।
২০২৫-এর শেষ দিনে দাঁড়িয়ে তাই আমি পশ্চিমবঙ্গকে দেখি এক সম্ভাবনাময় বাস্তবতা হিসেবে, যে নিজের শক্তির পুরো ব্যবহার করতে পারেনি। এখানকার মানুষ পরিশ্রমী, মাটি উর্বর, স্মৃতি গভীর। কিন্তু এই সব কিছুকে একসাথে বেঁধে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার যে আত্মবিশ্বাস দরকার, সেটা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
তবু এই রাজ্যের ইতিহাস জানে, পশ্চিমবঙ্গ বহুবার থেমেছে, আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আজকের এই নীরবতা যদি হিসেব কষার নীরবতা হয়, যদি এটা নতুন করে ভাবার বিরতি হয়, তাহলে আগামী দিনের গল্প এখনও লেখা বাকি। বছরের শেষ দিনে আমার অনুভব খুব সহজ। পশ্চিমবঙ্গ আজও বাঁচতে জানে। এবার তাকে আবার ভরসা করতে শেখাতে হবে নিজের ওপর, নিজের ভবিষ্যতের ওপর।
