ভাষার আবেগে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে গভীর সাম্প্রদায়িক সংকট, উঠছে গুরুতর অভিযোগ। ওড়িশায় (Odisha) বাঙালিদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র রাজনৈতিক চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বাংলার শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছে, শুধুমাত্র বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণেই ওড়িশায় বাঙালিদের উপর হামলা চালানো হচ্ছে। শাসকদলের একাধিক সহযোগী সংগঠনও একই সুরে প্রচার চালাচ্ছে—“বাংলা বললেই মার।” কিন্তু বিষয়টি কি আদৌ শুধুই ভাষাগত বিদ্বেষের ফল? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে আরও গভীর ও বিপজ্জনক সাম্প্রদায়িক বাস্তবতা? ঘটনাপ্রবাহ খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করলে সামনে আসছে এক ভয়াবহ ছবি, যা ভাষা নয় বরং ধর্মীয় পরিচয়কেই মূল টার্গেট হিসেবে তুলে ধরছে।
ওড়িশা মানেই বাঙালির মনে ভেসে ওঠে পুরীর জগন্নাথ ধাম, কোনার্কের সূর্যমন্দির কিংবা ভুবনেশ্বরের ঐতিহ্যবাহী মন্দিরনগরী। বহু দশক ধরেই এই রাজ্য বাঙালিদের কাছে শুধু তীর্থস্থান নয়, জীবিকার অন্যতম ভরসাস্থল। রাজমিস্ত্রি, নির্মাণশ্রমিক, ফেরিওয়ালা, পোল্ট্রি কর্মী, কারখানার শ্রমিক—হাজার হাজার বাঙালি প্রতি বছর ওড়িশার নানা জেলায় কাজ করতে যান। এতদিন পর্যন্ত ভাষা বা সংস্কৃতি নিয়ে বড়সড় সংঘাতের নজির ছিল না। পর্যটন, নির্মাণ বা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত বাঙালিদের উপর ভাষাগত কারণে আক্রমণের ঘটনাও সচরাচর শোনা যেত না।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে গত বছরের চৈত্র মাস থেকে। বিশেষ করে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে পরিস্থিতি দ্রুত জটিল আকার নেয়। বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার সামশেরগঞ্জ, সুতি ও ধুলিয়ান অঞ্চলে ওয়াকফ আইন বিরোধী আন্দোলনের নামে যে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়ে, তার রেশ গিয়ে পড়ে ভিন রাজ্যে কর্মরত বাঙালি শ্রমিকদের উপর। ওই সময় হিন্দুদের ঘরবাড়ি ভাঙচুর, দোকান লুট এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গোটা রাজ্য তোলপাড় হয়। হরগোবিন্দ দাস ও তাঁর ছেলে চন্দন দাসকে কুপিয়ে খুন করার ঘটনা সমাজে গভীর আতঙ্ক ছড়ায়।
এই ঘটনার পর থেকেই ওড়িশায় বসবাসকারী বাঙালিদের একাংশের উপর আক্রমণ বাড়তে থাকে। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এই নির্যাতনের শিকারদের অধিকাংশই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত বাঙালি। অর্থাৎ সমস্যা কেবল ভাষাগত নয়, বরং ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করেই বিদ্বেষ আরও তীব্র আকার নিচ্ছে।
আরও গভীরে গেলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। যাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন, তাঁদের বড় অংশের বাড়ি মুর্শিদাবাদ জেলায়। কিছু মালদহের বাসিন্দাও রয়েছেন। উল্লেখযোগ্যভাবে, মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জের আগেই মালদহের মোথাবাড়িতে হিন্দুদের উপর তাণ্ডব চালানো হয়েছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই ওড়িশায় কর্মরত মালদহ ও মুর্শিদাবাদের পরিযায়ী শ্রমিকদের প্রতি সন্দেহ ও বিদ্বেষ বাড়তে শুরু করে। যেন বাংলার সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার দায় এসে পড়ছে ওড়িশায় কর্মরত সাধারণ শ্রমিকদের ঘাড়ে।
এই আবহেই নতুন করে উত্তেজনা ছড়ায় বেলাডাঙায় বাবরি মসজিদের শিলান্যাস ঘিরে। তৃণমূল বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের ভূমিকা ও বক্তব্য নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক। অনেকের মতে, এই ঘটনাই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। সামাজিক মাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়তেই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ আরও তীব্র হয়। এর কিছুদিন পর ময়মনসিংহে দীপুচন্দ্র দাস হত্যার ঘটনাও পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। এই সব ঘটনার যোগফল হিসেবেই ওড়িশায় সংখ্যালঘু বাঙালিদের উপর আক্রমণের প্রবণতা বেড়ে যায় বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।
তবু প্রকাশ্যে এই জটিল বাস্তবতাকে আড়াল করে বিষয়টিকে ‘ভাষা বনাম ভাষা’ সংঘাতে রূপ দেওয়ার চেষ্টা চলছে। বিজেপিকে ‘বাংলা-বিরোধী’ তকমা দিয়ে ওড়িশা সরকারকে কাঠগড়ায় তোলার রাজনৈতিক প্রচার জোরদার হয়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত স্পষ্ট প্রমাণ নেই যে ওড়িশার শাসকদল বা প্রশাসন সরাসরি এই নির্যাতনে মদত দিচ্ছে। বরং স্থানীয় স্তরে উগ্র মানসিকতা ও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার সুযোগ নিয়ে কিছু গোষ্ঠী এই হিংসা চালাচ্ছে বলেই অভিযোগ উঠছে।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ওড়িশায় কর্মরত বহু বাঙালি শ্রমিকের কাছে রাজ্যটি এখন আতঙ্কের আরেক নাম হয়ে উঠেছে। শুধু একদিনেই নতুন করে অন্তত ৩২ জন বাঙালি শ্রমিকের উপর হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। আক্রান্তদের বড় অংশই মুর্শিদাবাদ জেলার বাসিন্দা। অভিযোগ উঠেছে, তাঁদের ‘বাংলাদেশি’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সেই অজুহাতে নির্মম অত্যাচার চালানো হচ্ছে। ভয়ে বহু শ্রমিক কাজ ফেলে বাড়ির পথে রওনা দিয়েছেন।
মুর্শিদাবাদের ভগবানগোলা, লালগোলা, ডোমকল ও জলঙ্গি ব্লক থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ জীবিকার সন্ধানে ভুবনেশ্বর, ভদ্রক ও বালেশ্বরে যান। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ রংমিস্ত্রি, কেউ ফেরিওয়ালা, কেউ আবার নির্মাণ শ্রমিক। সাম্প্রতিক হিংসার ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ভগবানগোলার কানাপুকুর সংলগ্ন গ্রামগুলির বাসিন্দারা। অভিযোগ, ভুবনেশ্বরের চন্দ্রশেখরপুর এলাকায় গভীর রাতে ঘুমন্ত অবস্থায় শ্রমিকদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়েছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ অভিযোগ হলো—কয়েকজন শ্রমিকের উপর চরম অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, এমনকি গোপনাঙ্গে লোহার রড ঢুকিয়ে দেওয়ার মতো পাশবিক অত্যাচারের কথাও উঠে এসেছে। যদিও প্রশাসনিক স্তরে এসব অভিযোগের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখনও হয়নি, তবু শ্রমিক পরিবারগুলির বর্ণনা শিউরে ওঠার মতো।
শুধু কাজের জায়গাতেই নয়, এখন ট্রেনে বাড়ি ফেরার পথেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বাঙালি শ্রমিকরা। ভুবনেশ্বর, বালেশ্বর বা ভদ্রক স্টেশনে পৌঁছতে গিয়েও তাঁদের উপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পরিচয়পত্র দেখাতে বাধ্য করা হচ্ছে, কোথাও আবার বাংলা ভাষায় কথা বললেই অকথ্য গালিগালাজ ও মারধরের শিকার হতে হচ্ছে। গ্রামগঞ্জে ফেরি করতে বেরোলেই পথ আটকে জেরা চলছে—‘কোথাকার লোক’, ‘বাংলাদেশি কি না’ এই প্রশ্নে শুরু হচ্ছে নিগ্রহ।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, ভদ্রক এলাকায় কাজ করতে যাওয়া ডোমকল ও জলঙ্গি ব্লকের অন্তত ২৫ জন শ্রমিকের কোনও খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিবারগুলির অভিযোগ, তাঁরা ফোন ধরছেন না, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এই পরিস্থিতিতে বহু শ্রমিক বিভিন্ন স্টেশনে আত্মগোপন করে আছেন, সুযোগ পেলেই ট্রেনে চেপে বাংলায় ফেরার চেষ্টা করছেন।
রাজ্য সরকারের তরফে কড়া পদক্ষেপের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে আতঙ্ক কাটছে না। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ জেলার হাজার হাজার পরিবার কার্যত দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। কারণ এই জেলাতেই ওড়িশাগামী শ্রমিকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
পরিসংখ্যান বলছে, শুধু ডোমকল ব্লক থেকেই প্রায় ১৫০০ থেকে ২০০০ জন মানুষ রাজমিস্ত্রি ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে ওড়িশায় কাজ করেন। জলঙ্গি ব্লক থেকে প্রায় এক হাজার শ্রমিক পোল্ট্রি ফার্মে যুক্ত। শমসেরগঞ্জ ব্লক, যা বিড়িশিল্পের জন্য পরিচিত, সেখান থেকে প্রায় ২২০০ মানুষ প্লাইউড ফ্যাক্টরি ও ঢালাইয়ের কাজে নিযুক্ত। সুতি-১ ও সুতি-২ ব্লক মিলিয়ে প্রায় ১০ থেকে ১৩ হাজার শ্রমিক রাস্তা নির্মাণ ও সেন্টারিংয়ের কাজে ওড়িশায় কর্মরত। এর বাইরে গোটা জেলা থেকে আরও প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ ফেরিওয়ালা হিসেবে বিভিন্ন জেলায় ঘুরে বেড়ান।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবিকা আজ হুমকির মুখে। অথচ গোটা সংকটকে শুধুই “ভাষার লড়াই” হিসেবে তুলে ধরলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হবে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের। তাঁদের মতে, ভাষার আবেগে ভর করে আসল সাম্প্রদায়িক প্রশ্নটিকে চাপা দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ শ্রমিকরা, যাঁদের কোনও রাজনৈতিক দায় নেই, কোনও দোষও নেই।
সব মিলিয়ে ওড়িশায় বাঙালিদের উপর সাম্প্রতিক হামলার ঘটনাগুলি নিছক ভাষাগত বিরোধ নয়, বরং তার ভিতরে গভীর সাম্প্রদায়িক ক্ষত ও প্রতিশোধের মনোভাব কাজ করছে বলেই ইঙ্গিত মিলছে। এই বাস্তবতাকে স্বীকার না করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। রাজনৈতিক তরজার ঊর্ধ্বে উঠে মানবিক ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপই এখন সময়ের দাবি।
