ইরানের বিপ্লবে বিপাকে বাংলার বামপন্থী বিপ্লবীরা

iran-gen-z-revolution-impact-on-bengal-left-politics

জেন জি আন্দোলন, ইসলাম বনাম শিকড়ে ফেরা, আর আদর্শিক সংকটে বঙ্গীয় বাম রাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান (Iran) এই মুহূর্তে এক অভূতপূর্ব সামাজিক ও রাজনৈতিক অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। লাগাতার বিক্ষোভ, সরকারি দমন-পীড়ন, প্রাণহানি, রাষ্ট্রীয় প্রতীক বদলের দাবি-সব মিলিয়ে ইরান কার্যত জ্বলছে। কিন্তু এই আগুনের আঁচ শুধু তেহরান, ইসফাহান বা মাশহাদে সীমাবদ্ধ নয়। আশ্চর্যজনকভাবে এই আন্দোলনের অভিঘাত এসে পড়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, বিশেষ করে বাংলার বামপন্থী বিপ্লবী মহলে।

যে বামপন্থীরা ভেনেজুয়েলা, কিউবা, ফিলিস্তিন বা বাংলাদেশের আন্দোলনে রাতারাতি রাস্তায় নামতে পারেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় বিপ্লবের ডাক দিতে পারেন, ইরানের প্রশ্নে এসে তারাই যেন দিশেহারা। সরকার পক্ষ নেবেন, না আন্দোলনকারীদের? দু’দিকেই বিপদ। ফলে চুপ থাকাই আপাতত সবচেয়ে নিরাপদ পথ-এমনটাই মনে করছেন অনেক বঙ্গীয় বাম চিন্তক ও সংগঠক।

   

জেন জি বিপ্লবে উত্তাল ইরান

বর্তমান ইরান আন্দোলনের চালিকাশক্তি মূলত ‘জেনারেশন জি’ বা জেন জি। ইরানের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৩০ বছরের আশেপাশে। এই তরুণ সমাজ ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া এবং পশ্চিমী সংস্কৃতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত। তারা একদিকে যেমন হলিউড, ইউরোপীয় জীবনযাপন দেখছে, তেমনই অন্যদিকে খুঁজে পাচ্ছে নিজেদের প্রাক-ইসলামিক পারস্য ইতিহাস-সাইরাস দ্য গ্রেট, আচেমেনীয় সাম্রাজ্য, জরথুস্ত্র ধর্ম, সিংহ ও সূর্যের পতাকা।

এই প্রজন্মের বড় অংশই মনে করছে, ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব তাদের ভবিষ্যৎ কেড়ে নিয়েছে। বাধ্যতামূলক হিজাব, কট্টর শরিয়া আইন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, অর্থনৈতিক সংকট-সব মিলিয়ে ক্ষোভ জমেছে বহু বছর ধরে। সাম্প্রতিক আন্দোলনে সেই ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়েছে। বহু জায়গায় মসজিদ ভাঙা হয়েছে, সরকারি ভবনে আগুন লেগেছে, খামিনির ছবি প্রকাশ্যে পোড়ানো হয়েছে। নারী আন্দোলনকারীরা প্রকাশ্যে হিজাব খুলে সিগারেট ধরাচ্ছেন-যা ইরানের সমাজে একপ্রকার বিপ্লবী প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ইসলাম মুছতে চায় বিপ্লবীরা?

এই আন্দোলনের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হল-ইরানের বিপ্লবীরা কেবল সরকারের বিরোধিতা করছে না, তারা সরাসরি ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই চ্যালেঞ্জ করছে। বহু আন্দোলনকারী প্রকাশ্যে দাবি তুলছেন-ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বাতিল করতে হবে, ফিরিয়ে আনতে হবে প্রাক-১৯৭৯ সালের জাতীয় পতাকা, যেখানে থাকবে সূর্য ও সিংহের প্রতীক।

এখানেই বাংলার বামপন্থীরা চরম সংকটে পড়ছেন। কারণ ভারতের বাম রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে ধর্মনিরপেক্ষতার নামে কার্যত ইসলামপন্থী অবস্থানের সঙ্গে এক ধরনের সহাবস্থান তৈরি করেছে। হিজাব বিতর্কে বাংলার বাম ছাত্র সংগঠনগুলির অবস্থান ছিল স্পষ্টভাবে ‘হিজাবের পক্ষে’। তাদের যুক্তি-হিজাব ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক, রাষ্ট্র বা সংখ্যাগুরু সমাজ তা নিষিদ্ধ করতে পারে না।

কিন্তু ইরানের বিপ্লবীরা তো ঠিক উল্টো কথা বলছেন। তারা বলছেন, হিজাব তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, এটি দমন-পীড়নের প্রতীক। তাহলে প্রশ্ন উঠছে-যাদবপুরে হিজাব প্রগতিশীল, আর তেহরানে হিজাব-বিরোধিতা প্রতিক্রিয়াশীল কেন?

সরকারের পক্ষ নিলেও বিপদ

অন্যদিকে, ইরানের সরকারের পক্ষ নেওয়াও বামপন্থীদের পক্ষে সহজ নয়। কারণ বাম রাজনীতি বরাবরই রাষ্ট্রের দমননীতির বিরোধিতা করে এসেছে। বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনের সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় তীব্র সমালোচনা করেছিলেন বহু বামপন্থী। ‘রাষ্ট্রের শোষণ’, ‘ফ্যাসিবাদী দমন’-এই শব্দগুলো ঘুরে ফিরেছে পোস্টে পোস্টে।

কিন্তু আজ ইরানের ক্ষেত্রে সেই একই ভাষা ব্যবহার করলে ইসলামিক রাষ্ট্রের বিরোধিতা করতে হয়। আবার সরকারের পক্ষ নিলে প্রগতিশীলতার মুখোশ খসে পড়বে। অতীতে ইউনুস জমানার অরাজকতা সামনে আসতেই অনেক বামপন্থী নিজেদের পুরনো পোস্ট ডিলিট করেছেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই ইরান প্রশ্নে আরও সতর্কতা।

গেরুয়া শিবিরের কটাক্ষ ও ট্রোল

এই আদর্শিক দোটানাকে হাতিয়ার করে আক্রমণে নেমেছে গেরুয়া শিবির। সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রোলের বন্যা। কেউ লিখছেন- “ইরান মাঙ্গে ইসলাম সে আজাদী…”
১৯৭৯ সালে শাহ পাহলভির পতন থেকে শুরু করে খোমেইনি ও খামিনির উত্থান, ইসলামী মৌলবাদ কীভাবে ধাপে ধাপে শক্তিশালী হয়েছে-এই দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরে বলা হচ্ছে, ধর্মের নামে সাধারণ মানুষকে উস্কে দেওয়া কতটা সহজ।

এই ট্রোল পোস্টগুলিতে আরও বলা হচ্ছে-তেলের অফুরন্ত ভাণ্ডারের ওপর বসেও ইরান আজ দরিদ্র, যুব সমাজের হারানোর কিছু নেই বলেই তারা নিজেরাই নিজেদের শহর পুড়িয়ে দিচ্ছে। আবার প্রবাসী রেজা পাহলভি আমেরিকার সাহায্য চাইছেন-যা নতুন করে ‘আমেরিকার পাপেট’ তত্ত্বকে উসকে দিচ্ছে।

যাদবপুর বনাম তেহরান: দ্বিচারিতার প্রশ্ন

প্রযুক্তিবিদ সুদীপ্ত গুহের ফেসবুক পোস্ট এই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি তুলনা টেনেছেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ও ইরানের মধ্যে। একদিকে ইরানের মহিলারা হিজাব ছেড়ে আন্দোলনে, অন্যদিকে যাদবপুরে হিজাবের দাবিতে সরব ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, প্রশাসন।

তার ব্যঙ্গাত্মক উপসংহার-
ইরানের প্রতিবাদীরা রক্ষণশীল, অশিক্ষিত, দেশদ্রোহী, আমেরিকার দালাল।
আর যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, সেক্যুলার, দেশপ্রেমী।

তার প্রশ্ন-এই উপসংহারের পিছনে যুক্তি কী?
উত্তর হিসেবে তিনি ব্যঙ্গ করে লেখেন-
“মার্ক্সবাদ সত্য, কারণ ইহা বিজ্ঞান।”

আদর্শিক সংকটে বাম রাজনীতি

সব মিলিয়ে ইরানের বিপ্লব বাংলার বাম রাজনীতির সামনে আয়না ধরেছে। এই আয়নায় স্পষ্ট হচ্ছে দ্বিচারিতা, নির্বাচনী প্রগতিশীলতা এবং আদর্শিক সুবিধাবাদ। ইসলাম যখন সংখ্যালঘু পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত, তখন তা প্রগতিশীল; আর ইসলাম যখন রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতীক, তখন তা ফ্যাসিবাদ-এই সরলীকরণ আর কতদিন টিকবে, সেই প্রশ্নই এখন উঠছে।

ইরানের জেন জি আন্দোলন শুধু একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এটি বিশ্বজুড়ে বাম রাজনীতির আদর্শিক কাঠামোকেই চ্যালেঞ্জ করছে। আর সেই চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে বাংলার বামপন্থী বিপ্লবীরা আজ সত্যিই বিপাকে।

এই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ খবর পেতে Google News-এ Kolkata24x7 ফলো করুন