Home Editorial ফাইলের অন্তরালেই রাজনীতি!

ফাইলের অন্তরালেই রাজনীতি!

ed-raid-mamata-banerjee-file-politics-rule-of-law-west-bengal

কয়েকদিন আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে (Bengal politics) এমন একটি দৃশ্য দেখা গেল, যা কোনও সাময়িক সংবাদচিত্র নয় বরং এই রাজ্যের প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার ব্যবহার সম্পর্কে গভীর প্রশ্ন তুলে দেয়। ইডি যখন আইপ্যাক-এর প্রতীক জৈনের বাড়িতে আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী রেড করতে গিয়েছিল, তখন সেটি ছিল একটি নিয়মতান্ত্রিক তদন্ত প্রক্রিয়া। ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোয় এই ধরনের রেড নতুন বা অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু সেই দিন ঘটনাস্থলে যা ঘটল, তা তদন্তের সীমা ছাড়িয়ে একটি রাজনৈতিক বার্তায় পরিণত হল।

Advertisements

হঠাৎ করেই সেখানে দৌড়ে হাজির হলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কোনও প্রশাসনিক বৈঠক নয়, কোনও আইনগত আলোচনাও নয়। হাতে ছিল একটি সবুজ রঙের ফাইল। সেই মুহূর্তে ওই সবুজ ফাইল যেন হয়ে উঠল ক্ষমতার প্রতীক, যেন প্রকাশ্যে বলা হল এই রাজ্যে আইন চলবে, কিন্তু রাজনৈতিক ইচ্ছার সীমার মধ্যেই।

   

একজন সাংবিধানিক পদে থাকা মুখ্যমন্ত্রী যখন সরাসরি একটি রেডের স্থলে উপস্থিত হন এবং কার্যত সেই রেডের পরিবেশ বদলে দেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এটি কি প্রশাসনিক দায়িত্ব, নাকি তদন্ত প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ। সংবিধান অনুযায়ী তদন্তকারী সংস্থাগুলি আদালতের অধীনে কাজ করে। রাজনৈতিক নির্বাহীর দায়িত্ব সেই প্রক্রিয়াকে সহায়তা করা, প্রভাবিত করা নয়। যদি কেউ নির্দোষ হন, তাহলে তদন্তই সেই সত্য প্রতিষ্ঠা করবে। কিন্তু তদন্ত শুরু হতেই যদি ক্ষমতার ছায়া পড়ে, তাহলে সন্দেহ তৈরি হয়, আর সেই সন্দেহ শুধু একজন ব্যক্তিকে ঘিরে নয়, গোটা ব্যবস্থাকেই ঘিরে ধরে।

এই ঘটনার আরেকটি দিক আরও গভীরভাবে ভাবার মতো। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আসা লোকজন মুহূর্তের মধ্যে জমায়েত হল এবং আবার তার নির্দেশেই সরে গেল। এতে প্রশ্ন ওঠে এই প্রতিক্রিয়া কতটা স্বতঃস্ফূর্ত এবং কতটা নিয়ন্ত্রিত। গণতন্ত্রে মানুষের আবেগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই আবেগ যখন নির্দেশনির্ভর হয়ে ওঠে, তখন তা আর নাগরিক প্রতিবাদ থাকে না, বরং ক্ষমতার প্রদর্শনী হয়ে দাঁড়ায়।

অনেকে এই ঘটনাকে মানবিকতার আড়ালে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন। কিন্তু মানবিকতা আর আইনের স্বাভাবিক গতিপথে বাধা দেওয়া এক জিনিস নয়। একজন মুখ্যমন্ত্রী সহানুভূতিশীল হতে পারেন, কিন্তু তার প্রথম দায়িত্ব সংবিধান ও আইনের প্রতি। আজ যদি ইডির রেড এভাবে প্রশ্নের মুখে পড়ে, তাহলে আগামী দিনে অন্য কোনও তদন্তকারী সংস্থাও কি একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে না, সেই নিশ্চয়তা কোথায়।

এই সবুজ ফাইল আসলে আমাদের একটি বড় সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতি ক্রমশ এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ক্ষমতাই শেষ কথা হয়ে উঠছে। প্রশাসন, পুলিশ, এমনকি তদন্ত প্রক্রিয়াও অনেক সময় রাজনৈতিক বার্তার অধীন বলে মনে হচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হচ্ছে সাধারণ মানুষের আইনের ওপর বিশ্বাস। মানুষ ভাবতে শুরু করে আইন সবার জন্য সমান নয়, ক্ষমতাশালীদের জন্য আলাদা নিয়ম আছে।

গণতন্ত্র শুধু ভোটে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্র বাঁচে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতায়, প্রশ্ন করার অধিকারে এবং আইনের শাসনে। নাটকীয় উপস্থিতি, প্রতীকী ফাইল আর আবেগী বক্তব্য দিয়ে সাময়িক জনমত প্রভাবিত করা যায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা সমাজকে দুর্বল করে। রাজনৈতিকভাবে সচেতন হওয়ার মানে শুধু পক্ষ নেওয়া নয়, বরং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে শেখা।

আজকের এই ঘটনা হয়তো অনেকের কাছে একদিনের খবর। কিন্তু আসলে এটি একটি সতর্ক সংকেত। যদি আমরা এই ঘটনাগুলোকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিই, যদি প্রশ্ন তোলা বন্ধ করে দিই, তাহলে আগামী দিনে আইনের জায়গায় ক্ষমতা বসবে। তখন আর সবুজ ফাইলের রঙ নিয়ে বিতর্ক থাকবে না, বিতর্ক থাকবে গণতন্ত্র আদৌ টিকে আছে কি না।

Advertisements