উত্তরকাশি থেকে গঙ্গোত্রী- উন্নয়নের নামে হিমালয়ে পরিবেশ ধ্বংস

উন্নয়নের নামে কাটা পড়তে চলেছে প্রায় ১২ হাজার গাছ। ঠিক সেই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আরাবল্লী (Aravalli) পর্বতমালা ভারতের অন্যতম প্রাচীন পাহাড়—খনন ও নির্মাণের চাপে…

uttarkashi-gangotri-highway-project-tree-cutting-himalayan-environment-crisis
কৌন্তেয় নাগ
কৌন্তেয় নাগ

উন্নয়নের নামে কাটা পড়তে চলেছে প্রায় ১২ হাজার গাছ। ঠিক সেই সময়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ আরাবল্লী (Aravalli) পর্বতমালা ভারতের অন্যতম প্রাচীন পাহাড়—খনন ও নির্মাণের চাপে ক্ষতবিক্ষত। প্রশ্ন একটাই, পরিবেশ ধ্বংস করে এই উন্নয়ন কার স্বার্থে!! মানুষই যদি না থাকে!! পুঁজিপতিদের স্বার্থে ? একাধিক বড় প্রকল্পপের চাপে উত্তরকাশীতে উন্নয়নের পরিকল্পনার ছবিটা ভয় ধরানো।

Advertisements

গঙ্গোত্রী হাইওয়ে প্রকল্পে প্রায় ৬,৮০০ গাছ, আর বাগেশ্বর–কান্ডা জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণে প্রায় ৬,০০০-এর বেশি গাছ—সব মিলিয়ে মোট প্রায় ১২ হাজারের বেশি গাছ কাটা পড়ার আশঙ্কা। এটি একটি ভয়ানক উন্নয়ন পরিকল্পনার সিদ্ধান্ত, হিমালয়ের ঢাল আর মাটির প্রাকৃতিক সুরক্ষা ব্যবস্থার ওপর ভয়াবহ আঘাত, যা ভূমি ধসকে ত্বরান্বিত করবে।

   

গঙ্গোত্রী হাইওয়ে প্রকল্প ঘিরে বিতর্ক শুরু হয়েছে মূলত এই গাছ কাটাকে কেন্দ্র করেই। রাস্তা চওড়া করার জন্য পাহাড়ের গা ঘেঁষে বনভূমি কাটা হচ্ছে, যা স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশবিদদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গাছ কাটা মানে এখানে শুধু সবুজ অরণ্য ধ্বংস নয়—এর মানে পাহাড়ের মাটিকে আলগা করে দেওয়া, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করা এবং ভবিষ্যতের ভূমিধসের বীজ বপন করা। হিমালয় পর্বতের প্রকৃতি হঠাৎ করেই ধ্বংসলীলা দেখায়। কিন্তু এসব নেতা মন্ত্রী পরিকল্পনা রূপকারদের মাথায় ঢোকে না। তারা মুনাফা কামাতেই ব্যস্ত।

একই সময়ে কুমায়ুন অঞ্চলে বাগেশ্বর–কান্ডা জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণ প্রকল্প পাহাড়ি পরিবেশের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে। বাগেশ্বর ও আলমোড়া জেলায় হাজার হাজার গাছ কাটার পরিকল্পনা পাহাড়ের সেই পুরোনো সমস্যাকেই আবার সামনে আনছে—ঢাল কেটে রাস্তা বানানো, কাটা মাটি নিচে ফেলে রাখা, আর বর্ষা এলেই ধস নামা। এরপর আবার “মেরামত”-এর নামে নতুন করে পাহাড় কাটা—এই চক্র থেকে পাহাড় যেন আর বেরোতেই পারছে না!
উপরের দুই প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কেদারনাথ রোপওয়ে প্রকল্প।

এখানে সমস্যা হচ্ছে ভঙ্গুর হিমালয়ের বহনক্ষমতা ও অতিরিক্ত চাপ। রোপওয়ে চালু হলে যাত্রা সহজ হবে, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যাত্রা যত সহজ হবে, তীর্থযাত্রীর সংখ্যা তত বাড়বে। ইতিমধ্যেই কেদারনাথ অঞ্চলে অতিরিক্ত ভিড়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং জলসঙ্কট প্রকট। এই দুর্বল পাহাড়ি পরিবেশে হাজার হাজার মানুষের চাপ দীর্ঘমেয়াদে বিপদ ডেকে আনবে। এই ধ্বংস লীলার পুরো চিত্রটা শুধু উত্তরাখণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়।

ওদিকে আরাবল্লীর ধ্বংস মানে শুধু পাহাড় হারানো নয়। এর প্রভাব পড়ে ভূগর্ভস্থ জলস্তর, মরুকরণ প্রতিরোধ এবং উত্তর ভারতের সামগ্রিক জলবায়ুর ওপর।
একদিকে হিমালয়ের ঢাল দুর্বল হচ্ছে, অন্যদিকে আরাবল্লীর প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ছে—দু’দিক থেকেই পরিবেশগত নিরাপত্তা দুর্বল হচ্ছে।
এই সব পরিকল্পনার উদ্বেগ জনক দিক হচ্ছে, প্রকল্পগুলোর পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন হয় খাতায় কলমে। বহনক্ষমতা, বিকল্প রুট, দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির হিসাব—এই সবকে পাশ কাটিয়ে দ্রুত দৃশ্যমান উন্নয়নকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু পাহাড়ে উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা বা রোপওয়ে নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবন, জল, মাটি আর ভবিষ্যৎ।
উন্নয়ন দরকার,কিন্তু হিমালয়ের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলে উন্নয়নের অর্থ হওয়া উচিত সংযত, বৈজ্ঞানিক ও দায়িত্বশীল পরিকল্পনা। নির্বিচারে গাছ কাটা, পাহাড় চিরে রাস্তা বানানো আর ভিড় বাড়ানো উন্নয়ন নয় এটা ভবিষ্যতের বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানো।

উত্তরকাশি থেকে গঙ্গোত্রী, বাগেশ্বর থেকে কেদারনাথ—এই প্রায় ১২ হাজার গাছের হিসাব আসলে আমাদেরই ভবিষ্যতের হিসাব। আজ যদি পাহাড়ের শিকড় কেটে ফেলি, কাল সেই পাহাড়ই ভেঙে পড়বে—ভূমিধস, বন্যা, জলসংকট আর এক স্থায়ী পরিবেশগত ক্ষতির রূপ নিয়ে।

প্রশ্ন হচ্ছে, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি আর মন্দির বানাতে ব্যস্ত সরকার আদৌ কি সাধারণ মানুষের কথা ভাবে? নাকি,আদানি আম্বানিদের খুশি করতেই তারা ক্ষমতায় রয়েছে?

(লেখক পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সক্রিয় সদস্য)

Advertisements