ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডে মহিলা বিনিয়োগকারীদের (Women Investors) সংখ্যা পুরুষদের তুলনায় কম হলেও, তাদের সম্পদ ব্যবস্থাপনার (এইউএম) পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এএমএফআই (অ্যাসোসিয়েশন অফ মিউচুয়াল ফান্ডস ইন ইন্ডিয়া) এবং ক্রিসিল ইন্টেলিজেন্সের ‘ফ্রম সেভিংস টু ওয়েলথ ক্রিয়েশন’ রিপোর্টে এই তথ্য উঠে এসেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতের মিউচুয়াল ফান্ডে মোট বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মাত্র ২৫.১% মহিলা হলেও, ব্যক্তিগত বিনিয়োগকারীদের মোট সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে তাদের অংশগ্রহণ পুরুষদের তুলনায় বেশি। এটি ইঙ্গিত করে যে মহিলারা প্রতি বিনিয়োগে বড় অঙ্কের টাকা লগ্নি করছেন।
Women Investors উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো শীর্ষে
রিপোর্টে বলা হয়েছে, ১৩টি রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জাতীয় গড়কে ছাড়িয়ে মহিলাদের এইউএম অবদানে এগিয়ে রয়েছে। মিজোরাম ৪৪.১% অংশগ্রহণের সঙ্গে শীর্ষে রয়েছে। এরপর রয়েছে নাগাল্যান্ড (৩৯.১%), আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ (৩৮.৬%), সিকিম (৩৭.৯%), গোয়া (৩৭.২%) এবং নয়াদিল্লি (৩৬.৮%)। এছাড়া মহারাষ্ট্র (৩৫.৪%), গুজরাট (৩৪.২%) এবং পশ্চিমবঙ্গ (৩৩.৩%)ও এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো, যেমন মিজোরাম এবং নাগাল্যান্ড, তাদের মাতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো এবং মহিলাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক রীতিনীতির জন্য আলাদা করে চিহ্নিত হয়েছে। এএমএফআই-ক্রিসিল রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই অঞ্চলগুলোর এই সামাজিক বৈশিষ্ট্য মহিলাদের আর্থিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্রিয় ভূমিকা নিতে উৎসাহিত করছে। মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং গোয়ার মতো রাজ্যগুলো উচ্চ সাক্ষরতার হার এবং প্রগতিশীল সামাজিক সূচকের জন্যও পরিচিত, যা বিনিয়োগে তাদের শক্তিশালী অংশগ্রহণকে সমর্থন করে।
অন্যদিকে, নয়াদিল্লি, মহারাষ্ট্র এবং গুজরাটের মতো অর্থনৈতিক কেন্দ্রগুলো উচ্চ আর্থিক সচেতনতা, শক্তিশালী অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং সাক্ষরতার হারের সুবিধা ভোগ করছে। এই রাজ্যগুলোতে মহিলারা আর্থিক বাজারে ক্রমশ সক্রিয় হয়ে উঠছেন।
নিম্ন অংশগ্রহণের রাজ্যগুলো
বিপরীতে হরিয়ানা, রাজস্থান এবং বিহারের মতো রাজ্যগুলোতে মহিলাদের এইউএম অংশগ্রহণ কম। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই রাজ্যগুলোতে নিম্ন সাক্ষরতার হার এবং সীমিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এই পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ। এই অঞ্চলগুলোতে মহিলাদের আর্থিক সচেতনতা এবং বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর জন্য আরও উদ্যোগ প্রয়োজন।
মহিলা বিনিয়োগকারীদের সম্পদ বৃদ্ধি
এএমএফআই-ক্রিসিল রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, মহিলা বিনিয়োগকারীদের সম্পদ ব্যবস্থাপনা গত পাঁচ বছরে দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ২০১৯ সালের মার্চে এই পরিমাণ ছিল ৪.৫৯ লক্ষ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালের মার্চে পৌঁছেছে ১১.২৫ লক্ষ কোটি টাকায়। এছাড়া, বি৩০ (শীর্ষ ৩০ শহরের বাইরের) শহরগুলোতে মহিলা বিনিয়োগকারীদের এইউএম-এর অংশ ২০১৯ সালে ২০.১% থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ২৫.২%-এ পৌঁছেছে। এটি নন-মেট্রো অঞ্চলে মিউচুয়াল ফান্ডের গভীর প্রবেশকে নির্দেশ করে।
মহিলাদের বিনিয়োগের প্রবণতা
রিপোর্টে দেখা গেছে, মহিলা বিনিয়োগকারীরা পুরুষদের তুলনায় বেশি পরিমাণে টাকা বিনিয়োগ করছেন। এটি তাদের আর্থিক পরিকল্পনায় দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং স্থিতিশীলতার প্রতি ঝোঁকের ইঙ্গিত দেয়। মিউচুয়াল ফান্ডে মহিলাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি আর্থিক স্বাধীনতা এবং সচেতনতার একটি শক্তিশালী সূচক। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোতে এই প্রবণতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়, যেখানে সামাজিক কাঠামো মহিলাদের আর্থিক সিদ্ধান্তে অংশ নিতে উৎসাহিত করে।
আর্থিক সাক্ষরতা ও সামাজিক প্রভাব
এএমএফআই-এর চেয়ারম্যান নবনীত মুনোত বলেন, “মিউচুয়াল ফান্ডে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান অংশগ্রহণ তাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের প্রমাণ। আমরা মহিলাদের মধ্যে আর্থিক সাক্ষরতা এবং অন্তর্ভুক্তির একটি ইতিবাচক প্রবণতা দেখতে পাচ্ছি, যা সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।” তিনি আরও জানান, এএমএফআই ‘বিকশিত ভারত’ যাত্রার অংশ হিসেবে মহিলাদের জন্য আরও বিনিয়োগ সচেতনতা উদ্যোগ গ্রহণ করতে চায়।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর উচ্চ অংশগ্রহণের পিছনে তাদের মাতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা একটি বড় ভূমিকা পালন করছে। মিজোরাম এবং নাগাল্যান্ডে সম্পত্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে মহিলাদের প্রাধান্য এই অঞ্চলের মহিলাদের আর্থিক স্বাধীনতার প্রতিফলন। গোয়ার ক্ষেত্রে, উচ্চ সাক্ষরতা এবং পর্যটনভিত্তিক অর্থনীতি মহিলাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করেছে।
বি৩০ শহরে মিউচুয়াল ফান্ডের প্রসার
বি৩০ শহরে মহিলাদের এইউএম-এর অংশ বৃদ্ধি মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পের গ্রামীণ এবং আধা-শহুরে অঞ্চলে প্রবেশের সাফল্য দেখায়। এই অঞ্চলগুলোতে আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসার মহিলাদের বিনিয়োগে অংশ নিতে সাহায্য করছে। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই প্রবণতা ভারতের আর্থিক বাজারে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
হরিয়ানা, রাজস্থান এবং বিহারের মতো রাজ্যগুলোতে মহিলাদের কম অংশগ্রহণ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় চ্যালেঞ্জ। এই রাজ্যগুলোতে সাক্ষরতার হার বাড়ানো এবং আর্থিক শিক্ষার প্রসার ঘটানো জরুরি। সরকার এবং বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই অঞ্চলগুলোতে মহিলাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা সম্ভব।
অন্যদিকে, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং গোয়ার মতো রাজ্যগুলো অন্যান্য অঞ্চলের জন্য উদাহরণ স্থাপন করছে। এই রাজ্যগুলোর সাফল্য প্রমাণ করে যে সঠিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবেশ থাকলে মহিলারা আর্থিক বাজারে নেতৃত্ব দিতে পারেন।
এএমএফআই-ক্রিসিল রিপোর্ট ভারতের মিউচুয়াল ফান্ড শিল্পে মহিলাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তুলে ধরেছে। উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো এবং গোয়া, নয়াদিল্লির মতো অঞ্চলগুলো মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের পথ দেখাচ্ছে। গত পাঁচ বছরে মহিলা বিনিয়োগকারীদের সম্পদ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি এবং বি৩০ শহরে তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি ভারতের আর্থিক ভবিষ্যতের জন্য একটি শুভ সংকেত। তবে, সমস্ত রাজ্যে এই প্রবণতা ছড়িয়ে দিতে হলে আর্থিক সাক্ষরতা এবং অন্তর্ভুক্তির উপর আরও জোর দেওয়া প্রয়োজন। মহিলারা শুধু সঞ্চয় নয়, সম্পদ সৃষ্টির দিকেও এগিয়ে যাচ্ছেন—এটি ভারতের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।