দেশজুড়ে দ্বিতীয়বার UPI বিভ্রাটে গ্রাহকদের ফান্ড ট্রান্সফারে সমস্যা

ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) গত এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৬ মার্চ) একটি বড়…

UPI Faces Second Outage

ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস (UPI) গত এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার বিঘ্নের সম্মুখীন হয়েছে। গত মঙ্গলবার (২৬ মার্চ) একটি বড় ধরনের সমস্যার পর বুধবার (২ এপ্রিল) ফের বহু ব্যবহারকারী তাদের ইউপিআই অ্যাপ ব্যবহার করতে অক্ষম হয়েছেন। এই ঘটনা দেশের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল কোটি কোটি মানুষের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

   

ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিঘ্ন ট্র্যাক করা ওয়েবসাইট ডাউন ডিটেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সন্ধ্যা ৭:১৮ নাগাদ প্রায় ৩৮৩ জন ব্যবহারকারী ইউপিআই-এর সেবায় সমস্যার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে ৫১% ব্যবহারকারী জানিয়েছেন যে তারা তহবিল স্থানান্তরে (ফান্ড ট্রান্সফার) সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, এবং ৪৭% ব্যবহারকারী পেমেন্ট সংক্রান্ত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন। এই ঘটনা ইউপিআই-এর ওপর নির্ভরশীল ব্যবহারকারীদের মধ্যে হতাশা ও অসুবিধার সৃষ্টি করেছে।

Advertisements

দেশের ডিজিটাল পেমেন্টের নোডাল সংস্থা ন্যাশনাল পেমেন্টস কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড (এনপিসিআই) জানিয়েছে, “কিছু ব্যাঙ্কে সাফল্যের হারে ওঠানামার কারণে ইউপিআই-তে কিছু বিরতিহীন হ্রাস দেখা গেছে। এই ওঠানামা ইউপিআই নেটওয়ার্কে বিলম্ব বাড়িয়েছে।” এনপিসিআই আরও জানিয়েছে যে তারা সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্কগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে এবং বর্তমানে “ইউপিআই স্থিতিশীল” রয়েছে। তবে, এই ঘোষণা সত্ত্বেও ব্যবহারকারীদের মধ্যে সেবার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এক সপ্তাহে দ্বিতীয় বিঘ্ন: ২৬ মার্চের ঘটনা

এর আগে, গত ২৬ মার্চ ইউপিআই সেবায় একটি বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছিল। ডাউন ডিটেক্টরের তথ্য অনুযায়ী, সেদিন রাত ৮টা নাগাদ ৩,০০০-এর বেশি ব্যবহারকারী ইউপিআই-সংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগ জানিয়েছিলেন। এর মধ্যে ৮১% ব্যবহারকারী পেমেন্ট ব্যর্থতার কথা বলেছেন, ১৪% তহবিল স্থানান্তরে সমস্যার সম্মুখীন হয়েছেন, এবং ৫% ব্যবহারকারী ইউপিআই অ্যাপে প্রবেশ করতে অসুবিধার কথা জানিয়েছেন। এই ঘটনার পর এনপিসিআই জানিয়েছিল যে “বিরতিহীন প্রযুক্তিগত সমস্যা”র কারণে এই বিঘ্ন ঘটেছে, এবং এক ঘণ্টার মধ্যে সেবা পুনরুদ্ধার করা হয়েছে।

তবে, এক সপ্তাহের মধ্যে দ্বিতীয়বার এই ধরনের সমস্যা দেখা দেওয়ায় ইউপিআই-এর অবকাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ইউপিআই প্রতিদিন কোটি কোটি লেনদেন পরিচালনা করে। এই ধরনের বিঘ্ন সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে বড় প্রভাব ফেলে, বিশেষ করে যারা নগদ অর্থের পরিবর্তে ডিজিটাল পেমেন্টের ওপর নির্ভরশীল।

UPI-এর গুরুত্ব ও জনপ্রিয়তা

ইউপিআই ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ। ২০১৬ সালে এনপিসিআই-এর উদ্যোগে চালু হওয়া এই প্ল্যাটফর্মটি তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তরের সুবিধা দেয়। গুগল পে, ফোনপে, পেটিএম-এর মতো জনপ্রিয় অ্যাপের মাধ্যমে ইউপিআই ব্যবহারকারীরা সহজেই পিয়ার-টু-পিয়ার (পি২পি) এবং পিয়ার-টু-মার্চেন্ট (পি২এম) লেনদেন করতে পারেন। এর বিনামূল্যে সেবা, সর্বনিম্ন লেনদেনের সীমা না থাকা এবং ২৪/৭ উপলব্ধতা এটিকে ভারতের খুচরো পেমেন্টের ৮০% এর বেশি লেনদেনের জন্য পছন্দের মাধ্যম করে তুলেছে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ইউপিআই লেনদেনের পরিমাণ ১৬.৯৯ বিলিয়ন ছাড়িয়েছে, যার মূল্য ২৩.৪৮ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। এটি যে কোনও মাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (জানুয়ারি পর্যন্ত) পি২এম লেনদেন মোট ইউপিআই ভলিউমের ৬২.৩৫% এবং পি২পি লেনদেন ৩৭.৬৫% অবদান রেখেছে। এই পরিসংখ্যান ইউপিআই-এর ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা এবং এর ওপর মানুষের নির্ভরতার প্রমাণ দেয়।

ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ও প্রতিক্রিয়া

বুধবারের এই বিঘ্নের পর সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের হতাশা প্রকাশ করেছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “ইউপিআই আবার ডাউন! এই হারে গিয়ে আমাকে হোটেলে বাসন ধুতে হবে।” আরেকজন লিখেছেন, “প্রথমবার ইউপিআই ডাউন হওয়ার প্রভাব দেখলাম। আমরা অনেকেই নগদ বহন করা বন্ধ করে দিয়েছি, এই সমস্যা জীবন-মরণ পরিস্থিতি তৈরি করেছে।” এই প্রতিক্রিয়াগুলো থেকে বোঝা যায় যে ইউপিআই-এর ওপর নির্ভরতা কতটা বেড়েছে এবং এর বিঘ্ন সাধারণ মানুষের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে।

সমস্যার কারণ ও সমাধানের প্রচেষ্টা

এনপিসিআই-এর মতে, বুধবারের সমস্যা কিছু ব্যাঙ্কের সাফল্যের হারে ওঠানামার কারণে হয়েছে। এই ওঠানামা নেটওয়ার্কে বিলম্ব সৃষ্টি করেছে, যার ফলে লেনদেন ব্যর্থ হয়েছে। তবে, এই সমস্যার মূল কারণ এখনও স্পষ্ট নয়। গত ২৬ মার্চের ঘটনায় এনপিসিআই “বিরতিহীন প্রযুক্তিগত সমস্যা”র কথা উল্লেখ করেছিল। এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি বিঘ্ন ইউপিআই-এর অবকাঠামোর দুর্বলতা এবং ব্যাকআপ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার দিকে ইঙ্গিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউপিআই-এর ক্রমবর্ধমান লেনদেনের পরিমাণ এবং ব্যাঙ্ক সার্ভারের ওপর চাপ এই সমস্যার অন্যতম কারণ হতে পারে। এনপিসিআই-কে আরও শক্তিশালী অবকাঠামো এবং বিকল্প ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করতে হবে বলে মত প্রকাশ করেছেন অনেকে।

ইউপিআই ভারতের ডিজিটাল অর্থনীতির একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে, এক সপ্তাহের মধ্যে দুটি বিঘ্ন এই সেবার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এনপিসিআই-এর দাবি সত্ত্বেও যে সিস্টেম স্থিতিশীল, ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলছে। ভারতের নগদবিহীন অর্থনীতির স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য ইউপিআই-এর মতো প্ল্যাটফর্মের স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এনপিসিআই-এর উচিত এই ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে এমন বিঘ্ন এড়াতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।