ভারতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই–কেন্দ্রিক প্রযুক্তি উন্নয়নে বিশাল পদক্ষেপ ঘোষণা করল মাইক্রোসফট। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকের পর সংস্থার সিইও সত্য নাদেলা ঘোষণা করেছেন যে, মাইক্রোসফট আগামী দিনে ভারতে দেড় লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ করবে। এশিয়া মহাদেশে মাইক্রোসফটের এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ, যা ভারতের প্রযুক্তি খাতে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
সত্য নাদেলার বক্তব্য অনুযায়ী, ভারত এখন বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম কেন্দ্র। ফলে মাইক্রোসফট ভারতের বাজারকে ভবিষ্যৎ নির্ধারণী হিসেবে দেখছে। তাঁর কথায়, “ভারতই ভবিষ্যৎ। আগামী দশক প্রযুক্তির, আর এই যাত্রায় ভারত হবে নেতৃত্বের আসনে।” এই মন্তব্যই স্পষ্ট করে দেয়—মাইক্রোসফট কেবল ব্যবসা বিস্তার নয়, বরং ভারতের ডিজিটাল ও প্রযুক্তিগত প্রেক্ষাপটকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা করছে।
এই দেড় লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ মূলত ব্যয় হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা–ভিত্তিক প্রকল্প, অ্যাপ্লিকেশন উন্নয়ন, ডেটা সেন্টার স্থাপন এবং উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটেশনাল অবকাঠামো তৈরিতে। ভারত বর্তমানে এআই গবেষণায় দ্রুত অগ্রসরমান দেশগুলির মধ্যে অন্যতম। সরকারি এবং বেসরকারি স্তরে এআই–চালিত উদ্যোগ যেমন—স্বাস্থ্য পরিষেবা, কৃষি, শিক্ষা, ব্যবসা ও সরকারি পরিষেবায় ডিজিটাইজেশন—ইতিমধ্যেই গুরুত্ব পেয়েছে। মাইক্রোসফটের এই বিশাল বিনিয়োগ সেই প্রবৃদ্ধিকে আরও গতিশীল করবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। এআই প্রযুক্তি উন্নয়ন ছাড়াও মাইক্রোসফট ভারতজুড়ে নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে জোর দেবে। এর ফলে দেশীয় ব্যবসায়িক সংস্থাগুলি ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং দ্রুতগতির প্রযুক্তি পরিষেবায় সহজলভ্য সুযোগ পাবে। প্রযুক্তিভিত্তিক ছোট এবং মাঝারি শিল্পগুলোর জন্য এটি হবে এক বড় সহায়তা।
সত্য নাদেলা দিল্লিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। বৈঠকে আলোচনার মূল বিষয় ছিল আগামী কয়েক বছরে ভারতের প্রযুক্তিগত বিপ্লবকে দ্রুততর করা। প্রধানমন্ত্রী মোদী ইতিমধ্যেই ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়া’, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ এবং সাম্প্রতিক ‘এআই ফর অল’ অভিযানের মাধ্যমে ভারতে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নিয়েছেন।
নাদেলার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, কেন্দ্র সরকারের নীতি, ডেটা সুরক্ষা কাঠামো এবং দ্রুত অগ্রসরমান স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম মাইক্রোসফটকে এই বিনিয়োগের প্রতি উৎসাহিত করেছে। মাইক্রোসফট মনে করে—ভারতের তরুণ কর্মশক্তি এবং নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করার দ্রুত ক্ষমতা ভবিষ্যতে ভারতের প্রতিযোগিতামূলক শক্তিকে বহু গুণ বাড়িয়ে তুলবে।
এই দেড় লক্ষ কোটি টাকার বিনিয়োগ সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন শিল্প মহল। এআই গবেষণা, ক্লাউড পরিষেবা, ডেটা হোস্টিং, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট এবং সাইবার নিরাপত্তা—এসব খাতে নতুনভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ভারতের আইটি পরিষেবা খাতও এই বিনিয়োগ থেকে বড় উপকার পাবে। এছাড়া স্টার্টআপদের জন্য মাইক্রোসফটের বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা চালু হতে পারে—যার ফলে ভারতজুড়ে ইনোভেশন ও প্রযুক্তি–নির্ভর উদ্যোগ আরও শক্তিশালী হবে।
মাইক্রোসফটের এই ঘোষণা কেবল একটি বিনিয়োগ নয়; এটি ভারতের গ্লোবাল প্রযুক্তি হাবে পরিণত হওয়ার চলমান প্রক্রিয়ার এক নতুন অধ্যায়। বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আধুনিক অর্থনীতির রূপ পরিবর্তন করছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের প্রতি মাইক্রোসফটের আস্থা আন্তর্জাতিক বাজারেও শক্ত বার্তা দেবে—ভারত এখন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ গঠনের অন্যতম প্রধান দেশ।
