চ্যাটজিপিটি-র নির্মাতা ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান গত কয়েকদিন ধরে সপ্তম স্বর্গে বিচরণ করছেন। তার কারণ, চ্যাটজিপিটি-র সাম্প্রতিক জিপিটি-৪ও আপডেটের পর স্টুডিও ঘিবলি (Ghibli)-শৈলীর ছবি তৈরির ক্ষমতা, যা বিশ্বব্যাপী ভাইরাল হয়ে উঠেছে। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা তাদের পরিবার, প্রিয়জন এবং জনপ্রিয় মিমের ছবিকে জাপানি অ্যানিমেশন স্টুডিও ঘিবলির স্বপ্নিল শৈলীতে রূপান্তরিত করছেন। এই উন্মাদনা এতটাই বেড়েছে যে অল্টম্যানকে টুইটারে (এক্স) ব্যবহারকারীদের কাছে হাতজোড় করে বলতে হয়েছে, “আপনারা কি একটু কম ছবি তৈরি করবেন? এটা পাগলামি, আমাদের দলের ঘুম দরকার।”
টুইটারে ইতিবাচকতার ঢেউ
এই ঘিবলি উন্মাদনা টুইটারে একটি বিরল ইতিবাচক পরিবেশ এনেছে। একজন ব্যবহারকারী, সোহেল আহমেদ, লিখেছেন, “দীর্ঘদিন পর এক্স-এ ইতিবাচকতা দেখতে পাচ্ছি। মানুষ তাদের পরিবার ও প্রিয়জনের সুন্দর ছবি শেয়ার করছে। ধন্যবাদ, স্যাম।” সোহেলের এই টুইটে অল্টম্যানের আসল বার্তাটি উদ্ধৃত করা হয়েছিল। জবাবে অল্টম্যান লেখেন, “এই প্ল্যাটফর্মটি সাধারণত বেশ নেতিবাচক। তাই আমরা যে সাময়িকভাবে কিছু আনন্দ আনতে পেরেছি, তাতে আমি খুশি।” এই মিথস্ক্রিয়া প্রমাণ করে যে ঘিবলি ট্রেন্ড কেবল প্রযুক্তির জয় নয়, বরং সামাজিক মাধ্যমে একটি সুখী মুহূর্তের সৃষ্টি করেছে।
অল্টম্যান ও মাস্কের কথার লড়াই
এই ঘটনার মধ্যে ওপেনএআই-এর সিইও স্যাম অল্টম্যান এবং টেসলা ও এক্সএআই-এর মালিক এলন মাস্কের মধ্যে পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। মাস্ক টুইটারে চ্যাটজিপিটি-র ঘিবলি ছবি তৈরির ক্ষমতা নিয়ে কটাক্ষ করেছেন। একটি টুইটে তিনি ইঙ্গিত করেন, ওপেনএআই মানবতার জন্য মহৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত সম্পদকে “বোকামির কাজে” নষ্ট করছে। এটি প্রথম নয় যে এই দুই প্রযুক্তি-বিশ্বের দৈত্য একে অপরের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।
চলতি বছরের শুরুতে, মাস্ক এবং তার বিনিয়োগকারীদের একটি দল ওপেনএআই-কে কেনার জন্য ৯৭.৪ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। মাস্কের দাবি, এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্য ছিল ওপেনএআই-এর অলাভজনক থেকে লাভজনক ব্যবসায় রূপান্তর বন্ধ করা। অল্টম্যান এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, “ওপেনএআই বিক্রির জন্য নয়।” তিনি মাস্কের এই পদক্ষেপকে “আমাদের গতি কমানোর চেষ্টা” হিসেবে অভিহিত করেন। জবাবে মাস্ক আদালতে দাবি করেন, যদি ওপেনএআই তার রূপান্তর বন্ধ করে, তবে তিনি তার প্রস্তাব প্রত্যাহার করবেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, অল্টম্যান বোর্ডের সামনে প্রস্তাবটি উপস্থাপনের আগেই তা প্রত্যাখ্যান করেছেন, যা তিনি “বিশ্বস্ত দায়িত্বের লঙ্ঘন” বলে মনে করেন।
Ghibli উন্মাদনার উৎস
এই ভাইরাল ঘিবলি উন্মাদনা শুরু হয়েছে গত সপ্তাহে চ্যাটজিপিটি-র জিপিটি-৪ও আপডেটের পর। এই আপডেটে আরও সঠিক টেক্সট রেন্ডারিং এবং জটিল প্রম্পট অনুসরণের ক্ষমতা যুক্ত হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে স্টুডিও ঘিবলি-শৈলীর ছবি তৈরির ফিচার। “স্পিরিটেড অ্যাওয়ে” এবং “হাউল’স মুভিং ক্যাসল”-এর মতো জনপ্রিয় জাপানি অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রের নির্মাতা স্টুডিও ঘিবলির এই শৈলী টুইটার এবং ইনস্টাগ্রামে ঝড় তুলেছে। ব্যবহারকারীরা তাদের সাধারণ ছবি আপলোড করে এবং সেগুলোকে ঘিবলির স্বপ্নিল, রঙিন এবং আবেগময় শৈলীতে রূপান্তরিত করছেন।
এই ট্রেন্ড এতটাই জনপ্রিয় হয়েছে যে ওপেনএআই-এর সার্ভারে চাপ পড়েছে। অল্টম্যান জানিয়েছেন, তাদের গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) “গলে যাচ্ছে”। তিনি ঘোষণা করেছেন যে অস্থায়ীভাবে ছবি তৈরির সংখ্যার উপর সীমা আরোপ করা হবে এবং বিনামূল্যে ব্যবহারকারীরা শীঘ্রই দিনে তিনটি ছবি তৈরি করতে পারবেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, এই সীমাবদ্ধতা বেশিদিন থাকবে না।
প্রযুক্তি ও শিল্পের সংঘর্ষ
এই ঘিবলি ট্রেন্ডের মাঝে একটি বিতর্কও উঠেছে। স্টুডিও ঘিবলির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হায়াও মিয়াজাকি ২০১৬ সালে এআই-জেনারেটেড শিল্পকে “জীবনের প্রতি অপমান” বলে সমালোচনা করেছিলেন। তার হাতে আঁকা অ্যানিমেশনের প্রতি ভালোবাসা এবং এআই-এর প্রতি তার বিরোধিতা এই ট্রেন্ডের প্রেক্ষাপটে আবার আলোচনায় এসেছে। অনেকে মনে করছেন, এই প্রযুক্তি শিল্পীদের কাজের স্বীকৃতি না দিয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। ওপেনএআই বর্তমানে নিউ ইয়র্ক টাইমস-সহ বিভিন্ন প্রকাশক এবং শিল্পীদের কাছ থেকে কপিরাইট লঙ্ঘনের মামলার মুখোমুখি হচ্ছে।
তবে ওপেনএআই দাবি করেছে, তারা জীবিত শিল্পীদের শৈলী অনুকরণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে, কিন্তু “বৃহত্তর স্টুডিও শৈলী” অনুমোদন করে। এই নীতি ব্যবহারকারীদের সৃজনশীলতাকে উৎসাহিত করছে বলে তারা মনে করে।
অল্টম্যান ও মাস্কের প্রতিদ্বন্দ্বিতা
অল্টম্যান এবং মাস্কের মধ্যে ব্যক্তিগত ও পেশাগত দ্বন্দ্ব দীর্ঘদিনের। মাস্ক ওপেনএআই-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের একজন ছিলেন, কিন্তু তিনি সংস্থাটির অলাভজনক থেকে লাভজনক মডেলে রূপান্তরের বিরোধিতা করে বেরিয়ে যান। তারপর থেকে তিনি এক্সএআই নামে নিজের এআই স্টার্টআপ চালু করেছেন। এই ঘিবলি ট্রেন্ডের মাঝে মাস্কের কটাক্ষ এবং তার ক্রিপ্টো-থিমযুক্ত ঘিবলি-শৈলীর ছবি শেয়ার করা তার প্রতিদ্বন্দ্বীকে খোঁচা দেওয়ার আরেকটি প্রচেষ্টা।
এই ঘিবলি উন্মাদনা প্রযুক্তি এবং শিল্পের একটি আকর্ষণীয় সংযোগস্থল তৈরি করেছে। ব্যবহারকারীরা তাদের স্মৃতি এবং সৃজনশীলতাকে নতুনভাবে প্রকাশ করছেন। তবে এটি কপিরাইট এবং এআই-এর নৈতিক ব্যবহার নিয়ে প্রশ্নও তুলেছে। অল্টম্যানের জন্য এটি একটি জয়, কিন্তু মাস্কের সঙ্গে তার লড়াই এবং শিল্পীদের সমালোচনা এই আনন্দের মাঝে ছায়া ফেলেছে।
চ্যাটজিপিটি-র ঘিবলি ট্রেন্ড একটি সাধারণ আপডেট থেকে বিশ্বব্যাপী উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে। স্যাম অল্টম্যানের আনন্দ এবং এলন মাস্কের কটাক্ষ এই গল্পে নাটকীয়তা যোগ করেছে। এটি কেবল প্রযুক্তির ক্ষমতা নয়, বরং মানুষের সৃজনশীলতা এবং সামাজিক মাধ্যমের শক্তির প্রমাণ। তবে এই ট্রেন্ডের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কী হবে, তা সময়ই বলবে।