সবুজ মাছির আক্রমণে অসম-বাংলায় চা শিল্পে ৫৫% ফলনের ক্ষতি!

পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের চা বাগানগুলোতে (Tea Industry) গ্রিনফ্লাই (সবুজ মাছি) নামে পরিচিত একটি ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন (টিআরএ)।…

Tea Industry in Crisis Greenfly Infestation Hits Assam & Bengal

পশ্চিমবঙ্গ এবং অসমের চা বাগানগুলোতে (Tea Industry) গ্রিনফ্লাই (সবুজ মাছি) নামে পরিচিত একটি ক্ষতিকর পোকার আক্রমণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন (টিআরএ)। শুক্রবার এই সংস্থাটি জানিয়েছে, গত দুই বছরে এই রস-চোষা পোকাটি চা গাছের জন্য একটি বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। এই আক্রমণের ফলে কিছু অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে, যা চা শিল্পের জন্য একটি গুরুতর সংকট তৈরি করেছে।

   

টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন, যিনি চা শিল্পের গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠিত এবং প্রধানত টি বোর্ডের তহবিলে পরিচালিত হয়, জানিয়েছে যে এই পোকার আক্রমণ বিশেষ করে শুষ্ক মাসগুলোতে চা গাছের ব্যাপক ক্ষতি করছে। টিআরএ-র সেক্রেটারি জয়দীপ ফুকন বলেছেন, “মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ফ্লাশের সময় এই গ্রিনফ্লাইয়ের আক্রমণ সবচেয়ে ভয়াবহ হয়ে ওঠে। এই সময়ে উৎপাদিত চা উচ্চ মানের এবং চাহিদার কারণে বাগানগুলো তাদের বার্ষিক আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি অর্জন করে। কিন্তু গ্রিনফ্লাইয়ের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ফসলের ক্ষতি শিল্পের অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে।”

Advertisements

গ্রিনফ্লাইয়ের আক্রমণ: একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি

গ্রিনফ্লাই একটি ছোট, সবুজ রঙের পোকা যা চা গাছের কচি পাতা এবং কুঁড়ি থেকে রস চুষে খায়। এর ফলে গাছের বৃদ্ধি ব্যাহত হয়, পাতা হলুদ হয়ে যায় এবং শুকিয়ে ঝরে পড়ে। বিশেষ করে শুষ্ক আবহাওয়ায় এই পোকার প্রজনন বেশি হয়, যা চা গাছের জন্য আরও ক্ষতিকর। টিআরএ জানিয়েছে, গত দুই বছরে এই পোকার আক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের চা বাগানগুলোতে ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে।

জয়দীপ ফুকন আরও বলেন, “এই পোকার আক্রমণ শুধু ফসলের পরিমাণই কমায়নি, বরং চায়ের গুণগত মানের ওপরও প্রভাব ফেলেছে। দ্বিতীয় ফ্লাশের চা বিশ্ব বাজারে তার স্বাদ এবং গন্ধের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু গ্রিনফ্লাইয়ের কারণে এই সময়ে উৎপাদিত চায়ের গুণমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা রপ্তানি এবং আয়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে।”

চা শিল্পে (Tea Industry) অর্থনৈতিক প্রভাব

অসম এবং পশ্চিমবঙ্গ ভারতের চা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। এই দুই রাজ্য মিলে দেশের মোট চা উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করে। তবে, গ্রিনফ্লাইয়ের আক্রমণের ফলে উৎপাদন কমে যাওয়ায় চা শিল্পে একটি অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে। টিআরএ-র তথ্য অনুযায়ী, কিছু অঞ্চলে ফসলের ক্ষতি ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত হয়েছে, যা বাগান মালিকদের আয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এছাড়া, চা শ্রমিকদের জীবিকার ওপরও এর প্রভাব পড়ছে, কারণ ফসল কম হওয়ায় তাদের কাজের সুযোগও হ্রাস পাচ্ছে।

দ্বিতীয় ফ্লাশের সময় উৎপাদিত চা সাধারণত বেশি দামে বিক্রি হয়। এই সময়ে উৎপন্ন প্রিমিয়াম চা বিশ্ববাজারে ভারতের খ্যাতি বাড়ায়। কিন্তু গ্রিনফ্লাইয়ের আক্রমণ এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উৎপাদন ব্যাহত করায় বাগান মালিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন। এটি শুধু চা শিল্পের জন্যই নয়, অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

জলবায়ু পরিবর্তনের ভূমিকা

টিআরএ-র বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এই সমস্যাকে আরও তীব্র করছে। গত কয়েক বছরে অসম এবং পশ্চিমবঙ্গে শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘায়িত হয়েছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরণে অনিয়ম দেখা গেছে। এই পরিবর্তন গ্রিনফ্লাইয়ের প্রজনন এবং বিস্তারের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফুকন বলেন, “চা গাছের জন্য একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রা এবং আর্দ্রতার ভারসাম্য প্রয়োজন। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, যা পোকার আক্রমণকে বাড়িয়ে তুলছে।”

এছাড়া, অতিরিক্ত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা এই সমস্যার সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফুড সেফটি স্ট্যান্ডার্ড অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (এফএসএসএআই) কিছু কীটনাশকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, যা চা শিল্পের জন্য পোকা নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। টিআরএ জানিয়েছে, তারা বিকল্প জৈব পদ্ধতির গবেষণা করছে, তবে এই সমাধান বাস্তবায়নে সময় লাগবে।

সমাধানের পথে টিআরএ-র উদ্যোগ

টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন এই সংকট মোকাবিলায় গবেষণা এবং উন্নয়নের কাজ ত্বরান্বিত করেছে। তারা জানিয়েছে, গ্রিনফ্লাইয়ের আক্রমণ রোধে জৈব কীটনাশক এবং প্রাকৃতিক শত্রু পোকার ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা চলছে। সম্প্রতি, টকলাই টি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অসমে ‘অ্যাসাসিন বাগ’ নামে পরিচিত একটি শিকারি পোকা চিহ্নিত করেছে, যা ক্ষতিকর পোকা খেয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। এই পোকাটি কয়েকটি চা বাগানে পরীক্ষামূলকভাবে ছেড়ে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে।

এছাড়া, টিআরএ জলবায়ু-সহনশীল চা বীজের উন্নয়নেও কাজ করছে। এই বীজগুলো উচ্চ তাপমাত্রা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মধ্যেও ভালো ফলন দিতে পারে। ফুকন বলেন, “আমরা চা শিল্পকে এই সংকট থেকে বাঁচাতে সব ধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োগ করছি। তবে এর জন্য সরকার এবং শিল্পের স্টেকহোল্ডারদের সমর্থন প্রয়োজন।”

সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন

টি অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (টিএআই)-এর মতো শিল্প সংগঠনগুলো এই সংকটে সরকারের কাছে আর্থিক সহায়তা এবং নীতিগত হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এবং অসম সরকারকে চা শিল্পের জন্য বিশেষ প্যাকেজ ঘোষণা করার আহ্বান জানানো হয়েছে। টিএআই-এর প্রেসিডেন্ট সন্দীপ সিংহানিয়া সম্প্রতি বলেছেন, “চা শিল্প যদি এই সংকট থেকে না বাঁচে, তবে এর প্রভাব শুধু বাগান মালিকদের ওপর নয়, লক্ষ লক্ষ শ্রমিকদের জীবিকার ওপরও পড়বে।”

গ্রিনফ্লাইয়ের আক্রমণ অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের চা শিল্পের জন্য একটি গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। টি রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশনের উদ্বেগ এবং গবেষণা এই সংকট মোকাবিলায় একটি আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে, এই সমস্যার সমাধানে বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা এবং শিল্পের সহযোগিতা অপরিহার্য। চা শিল্প ভারতের অর্থনীতি এবং সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই শিল্পকে বাঁচাতে এখনই সমন্বিত প্রচেষ্টা শুরু করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর না হয়।