মুকেশ আম্বানির নেতৃত্বে ক্যাম্পা কোলার প্রতিযোগিতামূলক দামের সঙ্গে টক্কর দিতে, আমুল, কোকা-কোলা, পেপসি এবং স্মুদের মতো পানীয় সংস্থাগুলি ১০ টাকার নিচে তাদের বাজেট-বান্ধব (Budget Beverages) পানীয় চালু করেছে। গ্রীষ্মের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে এই সংস্থাগুলি সাশ্রয়ী মূল্যের বিভিন্ন পানীয়—যেমন লস্যি, মিল্কশেক, ফিজি সোডা এবং ফলের রস—নিয়ে বাজারে বড়সড় বাজি ধরছে। প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে কোকা-কোলা এবং পেপসি স্বাস্থ্য-সচেতন গ্রাহকদের জন্য ১০ টাকায় ডায়েট এবং লাইট পানীয় চালু করেছে। থাম্বস আপ এক্স ফোর্স, কোক জিরো, স্প্রাইট জিরো এবং পেপসি নো-সুগার এই সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে বাজারে এসেছে।
১০ টাকার পানীয়: ভারতের ‘স্যাশে অর্থনীতি’র উত্থান
পানীয় নির্মাতাদের ১০ টাকার নিচে পানীয় বিক্রির প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ এফএমসিজি (ফাস্ট-মুভিং কনজিউমার গুডস) শিল্পের ‘স্যাশে মডেল’-এর সঙ্গে তুলনীয়। এই মডেলে কোম্পানিগুলি ছোট এবং সাশ্রয়ী প্যাকেটে ভোক্তা পণ্য বিক্রি করে। শ্যাম্পু, বিস্কুট, ডিটারজেন্টের মতো পণ্যের বিক্রয়ে স্যাশে বড় ভূমিকা পালন করে। একইভাবে, গ্রীষ্মের মরশুমে পানীয় নির্মাতারা তাদের ১০ টাকার বাজেট-বান্ধব পানীয় থেকে লাভের সুযোগ দেখছে। ‘স্যাশে মডেল’ যেমন ভোক্তাদের মধ্যে প্রিমিয়াম পণ্যের ব্যবহারকে গণতান্ত্রিক করে এবং বিস্তৃত গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেয়, তেমনই এই সাশ্রয়ী ব্র্যান্ডেড পানীয়গুলি সাধারণ মানুষের মধ্যে জনপ্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
পেপসি ও কোকা-কোলার ১০ টাকায় নো-সুগার পানীয়
গ্রাহকদের পরিবর্তনশীল পছন্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পেপসি এবং কোকা-কোলা তাদের ডায়েট এবং লাইট পানীয়ের পরিসর বাড়িয়েছে। ডায়েট কোক ছাড়াও কোক জিরো, স্প্রাইট জিরো এবং থাম্বস এক্স ফোর্সের মতো পানীয় চালু করা হয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পানীয়গুলি ১০ টাকা, ২০ টাকা এবং ৩০ টাকায় পাওয়া যাচ্ছে, যার পরিমাণ ২৫০ মিলি এবং ৫০০ মিলি। এই পদক্ষেপ স্বাস্থ্য-সচেতন গ্রাহকদের আকর্ষণ করার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ক্যাম্পা কোলার ১০ টাকার দাম নির্ধারণ
রিলায়েন্স গ্রুপ আক্রমণাত্মক দামের কৌশল নিয়ে পানীয় বাজারে প্রবেশ করেছে। ক্যাম্পা কোলার ২০০ মিলি বোতলের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ টাকা। প্রায় সব প্যাক সাইজ এবং ভ্যারিয়েন্টে ক্যাম্পা কোলা গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী হারে উপলব্ধ। ক্যাম্পা কোলা ছাড়াও রিলায়েন্স কনজিউমার স্পোর্টস ড্রিঙ্ক বাজারে প্রবেশ করেছে ‘স্পিনার’ নামে একটি পানীয় নিয়ে। ক্রিকেটার মুত্তিয়া মুরালিধরনের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি এই পানীয়টির দামও ১০ টাকা। এছাড়া, রিলায়েন্সের আরেকটি পণ্য ‘রসকিক গ্লুকো এনার্জি’ প্রতি একক সার্ভিংয়ের জন্য ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
১০ টাকার নিচে মিল্কশেক
ফ্রুটি নির্মাতা পার্লে অ্যাগ্রো ২০২১ সালে তাদের সাশ্রয়ী মিল্কশেক সিরিজ ‘স্মুদ’ চালু করেছিল। অভিনেতা বরুণ ধawanকে ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর করে এই সংস্থা ১০ টাকার নিচে টেট্রা প্যাকে বিভিন্ন স্বাদের মিল্কশেক অফার করছে। এই উদ্যোগটি গ্রাহকদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে।
আমুল কুল ফ্লেভার্ড মিল্ক
আমুল কুল তাদের মিনি সংস্করণের মিল্কশেক কাচের বোতল এবং টেট্রা প্যাকে ২০ থেকে ৪০ টাকার মধ্যে বিক্রি করছে। তবে তাদের লস্যি ১০ টাকায় বিক্রি হয় এবং এটি কোম্পানির জন্য উচ্চ পরিমাণে বিক্রয় তৈরি করে। এই সাশ্রয়ী দাম আমুলকে বাজারে শক্তিশালী অবস্থানে রাখছে।
১০ টাকার পানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা: এটি কি টেকসই?
ক্যাম্পা কোলার প্রতিযোগিতামূলক দামের বিরুদ্ধে টিকে থাকার চেষ্টায় প্রতিদ্বন্দ্বী সংস্থাগুলি যখন লড়াই করছে, তখন এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য লাভজনক হবে নাকি লাভের মার্জিন ক্ষতিগ্রস্ত করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইকোনমিক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিল্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে ১০ টাকার দাম খুব বেশি লাভজনক নয়। তবে, বড় প্যাকের দাম না কমিয়ে এই ক্ষতি পূরণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ?
ভারতের পানীয় বাজারে ১০ টাকার প্রতিযোগিতা শুধুমাত্র গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিয়ে আসছে না, বরং এটি কোম্পানিগুলির বাজারে প্রবেশ এবং সম্প্রসারণের কৌশলকেও নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। গ্রীষ্মকালে চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই সাশ্রয়ী পানীয়গুলি গ্রামীণ এবং শহুরে উভয় গ্রাহকদের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলছে। ক্যাম্পা কোলার আক্রমণাত্মক দাম নির্ধারণ কোকা-কোলা এবং পেপসির মতো প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলিকে তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করেছে।
প্রতিযোগিতার প্রভাব
ক্যাম্পা কোলার ১০ টাকার দাম বাজারে একটি নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে। এটি শুধুমাত্র গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিয়ে আসেনি, বরং অন্যান্য সংস্থাগুলিকে তাদের দাম এবং পণ্য পরিসরে পরিবর্তন আনতে উৎসাহিত করেছে। পেপসি এবং কোকা-কোলার নো-সুগার পানীয়গুলি স্বাস্থ্য-সচেতন গ্রাহকদের আকর্ষণ করছে, যখন আমুল এবং স্মুদের মতো ব্র্যান্ডগুলি ঐতিহ্যবাহী পানীয়ের সাশ্রয়ী সংস্করণ দিয়ে বাজারে টিকে থাকার চেষ্টা করছে।
ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
১০ টাকার পানীয় বাজারের এই প্রতিযোগিতা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই কিনা, তা সময়ই বলবে। তবে, এটি স্পষ্ট যে এই কৌশল ভারতের বিশাল গ্রাহক বেসকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। গ্রীষ্মের চাহিদা এবং সাশ্রয়ী দামের সমন্বয়ে এই পানীয়গুলি বাজারে নতুন গতিশীলতা আনতে পারে। কোম্পানিগুলি যদি এই মূল্যে গুণমান এবং বিতরণ বজায় রাখতে পারে, তবে এটি ভারতীয় পানীয় শিল্পে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন হতে পারে।
১০ টাকায় পানীয় বাজারে প্রতিযোগিতা কেবল গ্রাহকদের জন্য সাশ্রয়ী বিকল্প নিয়ে আসছে না, বরং এটি ভারতের পানীয় শিল্পে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করছে। ক্যাম্পা কোলার আক্রমণাত্মক দাম থেকে শুরু করে আমুল, পেপসি এবং কোকা-কোলার বাজেট-বান্ধব উদ্যোগ—এই প্রতিযোগিতা ভোক্তাদের জন্য উপকারী হলেও কোম্পানিগুলির লাভের ভারসাম্য বজায় রাখা একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। গ্রীষ্মের তাপকে হারাতে এই ১০ টাকার পানীয়গুলি কতটা সফল হবে, তা দেখার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।