মানি লন্ডারিং রুখতে এআই-কে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার করতে চায় আরবিআই

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর (RBI Governor) সঞ্জয় মালহোত্রা বুধবার জানিয়েছেন, মানি লন্ডারিংয়ের ক্রমবর্ধমান জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং (এমএল)…

Reserve Bank of India governor Sanjay Malhotra

রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়ার গভর্নর (RBI Governor) সঞ্জয় মালহোত্রা বুধবার জানিয়েছেন, মানি লন্ডারিংয়ের ক্রমবর্ধমান জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং মেশিন লার্নিং (এমএল) ভিত্তিক ঝুঁকি মূল্যায়ন কাঠামোকে ক্রমাগত উন্নত করতে হবে। তিনি বলেন, এটি ব্যবস্থার উন্নতি ও সুরক্ষার জন্য অপরিহার্য। মুম্বইয়ে অনুষ্ঠিত ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) প্রাইভেট সেক্টর কোলাবোরেটিভ ফোরাম ২০২৫-এর একটি অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিতে গিয়ে তিনি এই মন্তব্য করেন।

   

গভর্নর মালহোত্রা জানান, প্রযুক্তি একদিকে যেমন ব্যবসা করার কাজকে সহজ করেছে, তেমনি এটি মানি লন্ডারিং এবং অবৈধ অর্থায়নের জন্য নতুন ও অত্যন্ত জটিল পন্থা তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিতে ঝুঁকি মূল্যায়ন মডেলগুলোকে আরও পরিমার্জিত এবং উন্নত করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। তিনি কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোকে আর্থিক জগতের সাম্প্রতিক প্রবণতা এবং উন্নয়ন সম্পর্কে সচেতন থাকার আহ্বান জানান, যা অপরাধীদের দ্বারা কাজে লাগানো হতে পারে। তিনি বলেন, এই প্রবণতাগুলো বোঝার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কগুলোকে এমন নিয়ম ও কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা সন্দেহজনক লেনদেনকে প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করতে পারে এবং পূর্বেই প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়।

Advertisements

নীতিনির্ধারকদের জন্য সতর্কবার্তা

মালহোত্রা নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি সতর্কবার্তাও জারি করেছেন। তিনি বলেন, “আমরা যখন আমাদের আর্থিক ব্যবস্থাকে মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নের বিরুদ্ধে নিরাপদ ও সুরক্ষিত করার চেষ্টা করছি, তখন আমাদের নীতিনির্ধারক হিসেবে এটাও খেয়াল রাখতে হবে যেন আমাদের পদক্ষেপগুলো অতিরিক্ত উৎসাহী না হয়ে ওঠে এবং বৈধ কার্যকলাপ ও বিনিয়োগে বাধা না সৃষ্টি করে।” তিনি আরও যোগ করেন, “তাই আমাদের এমন আইন ও নিয়ম প্রণয়ন করতে হবে, যা শল্যচিকিৎসার মতো নির্ভুলভাবে শুধুমাত্র অবৈধ ও অপরাধমূলক কার্যকলাপকে লক্ষ্য করে, বরং ব্যাপক ও অস্পষ্ট হাতিয়ার ব্যবহার করে না, যা অনিচ্ছাকৃতভাবে সৎ ব্যক্তিদেরও ক্ষতিগ্রস্ত করে।”

ডেটার গুণমান ও প্রযুক্তির ভূমিকা

আরবিআই গভর্নর জোর দিয়ে বলেন, প্রাপ্ত ডেটার গুণমান উন্নত করা এবং ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং মেশিন লার্নিংয়ের সঠিক ব্যবহার করা অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, “এটি লেনদেনের স্ক্রিনিং এবং সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্তকরণে উন্নতি আনবে, যার ফলে ভুল, মিথ্যা পজিটিভ এবং মিথ্যা নেগেটিভ কমবে।” এই প্রযুক্তিগুলো ব্যবহার করে আর্থিক ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নিরাপদ করা সম্ভব বলে তিনি মনে করেন।

জি-২০ লক্ষ্য ও ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট

মালহোত্রা আরও জানান, আরবিআই ২০২৭ সালের মধ্যে জি-২০ রোডম্যাপের পরবর্তী পর্যায় কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি পূরণে কাজ চালিয়ে যাবে, যার লক্ষ্য হল অন্তর্ভুক্তিমূলক ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট ব্যবস্থা। তিনি বলেন, “আমরা সবাই জানি, এই ক্ষেত্রে অনেক কাজ বাকি আছে। আমার মনে হয়, এটা সময়ের ব্যাপার মাত্র, ক্রস-বর্ডার পেমেন্টও অনেক সহজ এবং খরচ-কার্যকর হয়ে উঠবে। জি-২০-এর উদ্দেশ্য—ক্রস-বর্ডার পেমেন্টকে দ্রুত, সস্তা, সুবিধাজনক এবং স্বচ্ছ করা—পূরণ করতে হলে ট্রাভেল রুলগুলোকে প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ করা উচিত।”

আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও গ্রাহকের অধিকার

আরবিআই গভর্নর এও বলেন, নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত নয়, যা আর্থিক অন্তর্ভুক্তিতে অনাকাঙ্ক্ষিত বাধা সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, “আমাদের গ্রাহকের অধিকার এবং সুবিধার প্রতি সচেতন থাকতে হবে, পাশাপাশি যথাযথ পরিশ্রমের (ডিউ ডিলিজেন্স) প্রয়োজনীয়তাগুলো পূরণ করতে হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, আর্থিক নিরাপত্তা ও অন্তর্ভুক্তির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলার প্রেক্ষাপটে এর তাৎপর্য

পশ্চিমবঙ্গে আর্থিক লেনদেন এবং ডিজিটাল ব্যাঙ্কিংয়ের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কলকাতা, হাওড়া, দুর্গাপুরের মতো শহরগুলোতে অনলাইন পেমেন্ট এবং ই-কমার্সের প্রসার ঘটেছে। তবে, এর সঙ্গে মানি লন্ডারিংয়ের ঝুঁকিও বেড়েছে। গভর্নর মালহোত্রার এই বক্তব্য বাংলার ব্যাঙ্ক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। এআই এবং এমএল ব্যবহার করে সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত করা এবং গ্রাহকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখানেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে ভারতের অবস্থান

ভারত এফএটিএফ-এর সদস্য হিসেবে মানি লন্ডারিং এবং সন্ত্রাসবাদের অর্থায়নের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গত কয়েক বছরে ভারতের প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। মালহোত্রার নেতৃত্বে আরবিআই এই প্রচেষ্টাকে আরও জোরদার করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ভারতের আর্থিক ব্যবস্থাকে শুধু নিরাপদই নয়, গ্রাহকবান্ধবও করতে হবে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা

গভর্নরের বক্তব্যে স্পষ্ট যে আরবিআই আগামী দিনে প্রযুক্তির উপর বেশি নির্ভর করবে। ব্লকচেইন প্রযুক্তির মাধ্যমে লেনদেনের স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং এআই দিয়ে ঝুঁকি শনাক্তকরণ দুটোই প্রধান লক্ষ্য। এছাড়া, ক্রস-বর্ডার পেমেন্ট সহজ করার জন্য জি-২০-এর সঙ্গে কাজ করা হবে। বাংলার ব্যবসায়ী এবং গ্রাহকদের জন্য এটি একটি ইতিবাচক খবর, কারণ এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকে আরও সহজ করতে পারে।

সঞ্জয় মালহোত্রার এই বক্তব্য ভারতের আর্থিক ব্যবস্থাকে নিরাপদ ও আধুনিক করার প্রতিশ্রুতি প্রতিফলিত করে। মানি লন্ডারিংয়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এআই এবং প্রযুক্তির ব্যবহার একটি নতুন যুগের সূচনা করতে পারে। তবে, তিনি যেমন বলেছেন, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ব্যবসা ও গ্রাহকদের সুবিধার প্রতি সমান গুরুত্ব দিতে হবে। বাংলার মানুষও এই উন্নয়নের দিকে নজর রাখবে, কারণ এটি তাদের দৈনন্দিন আর্থিক জীবনেও প্রভাব ফেলবে।