ত্রিপুরায় ভোজ্য তেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে চলেছে পতঞ্জলি (Patanjali) ফুডস। আগামী দুই বছরে রাজ্যের ১০,০০০ হেক্টর জমিতে তেল পাম চাষ সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করেছে সংস্থাটি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে শুধু ত্রিপুরাই নয়, গোটা উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে একটি তেল পাম হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চায় পতঞ্জলি।
সংস্থার উত্তর-পূর্বাঞ্চল প্রধান আশোক কুমার সিং এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেন, “ত্রিপুরার জলবায়ু ও মাটির গুণমান তেল পাম চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। আমরা রাজ্য সরকার ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে মিলিতভাবে কাজ করে আগামী দুই বছরে ১০,০০০ হেক্টর জমিতে এই চাষ সম্প্রসারণ করব।”
তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যেই সংস্থা রাজ্যে ৩০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণ করেছে, যেখানে একটি ‘ওয়ান-স্টপ সলিউশন’ কমপ্লেক্স গড়ে তোলা হবে। এই কেন্দ্রে থাকবে একটি আধুনিক প্রসেসিং মিল, একটি নার্সারি, একটি প্রদর্শনী ক্ষেত্র (ডেমো প্ল্যান্টেশন) এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণের জন্য একটি বিশেষ কেন্দ্র। তিন মাসের মধ্যেই এই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে আশ্বাস দেন সিং।
এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি রাজ্যে একটি কর্মশালার আয়োজন করা হয়, যেখানে রাজ্যের কৃষি ও উদ্যানপালন বিভাগের শীর্ষস্থানীয় আধিকারিকরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আইএএস সচিব অপূর্ব রায়, কৃষি বিভাগের পরিচালক ড. ফণি ভূষণ জমাতিয়া এবং উদ্যানপালন বিভাগের পরিচালক দীপক দাস। পতঞ্জলির পক্ষ থেকে কর্মশালায় উপস্থিত ছিলেন সংস্থার উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় উপদেষ্টা সুবাশ ভট্টাচার্য এবং ত্রিপুরা রাজ্য প্রধান অয়ন সরকার।
কর্মশালায় তেল পাম চাষের উপযোগিতা, প্রযুক্তিগত দিক ও সম্ভাব্য লাভ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়। কৃষকদের মাঝে আগ্রহ ও উৎসাহ লক্ষ্য করা যায়, যা এই উদ্যোগকে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক।
আশোক কুমার সিং জানিয়েছেন, পতঞ্জলি শুধুমাত্র চাষ করাবে না, বরং কৃষকদের সবরকম সহায়তা দেবে—মাটি পরীক্ষণ, চারা বিতরণ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে চাষের পরবর্তী পর্যায়ে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত। “আমরা কৃষকদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে চাই, যাতে তারা স্থায়ীভাবে লাভবান হতে পারেন,” বলেন তিনি।
এই উদ্যোগ রাজ্যের গ্রামীণ অর্থনীতি ও কৃষি খাতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তেল পাম চাষ একটি লাভজনক কৃষিকাজ হিসেবে পরিচিত, যার ফলে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি, এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে রাজ্যে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।
ভারতে প্রতিবছর যে বিপুল পরিমাণ ভোজ্য তেল আমদানি করতে হয়, সেই নির্ভরতা কমাতে দেশের নিজস্ব উৎপাদন বৃদ্ধির প্রয়াসে এটি একটি বড় পদক্ষেপ। পতঞ্জলির এই বিনিয়োগ শুধু অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
ত্রিপুরা সরকারের পক্ষ থেকেও এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হয়েছে। কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যের বিভিন্ন ব্লকে সম্ভাব্য জমির তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং স্থানীয় কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আরও কর্মশালার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে, পতঞ্জলি ফুডসের ‘টার্গেট ত্রিপুরা’ পরিকল্পনা শুধু একটি বিনিয়োগ প্রকল্প নয়—এটি রাজ্যের কৃষি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যা আগামী দিনে ত্রিপুরাকে ভারতের তেল পাম উৎপাদনের একটি অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে।