অয়ন চট্টোপাধ্যায়: বাংলার শিল্পের (Bengal Industry) হারিয়ে যাওয়া গৌরব কি আদৌ কোনোদিন ফিরবে? শিক্ষান্তে চাকরি পাওয়া কি আদেও সম্ভব? নাকি আগামী দিনেও এ রাজ্যের নতুন প্রজন্মকে স্রেফ একটা অনিশ্চিত রুটি-রুজির টানে ট্রেনে চেপে ভিন রাজ্যে পাড়ি দিতে হবে? এই প্রশ্ন আর একরাশ সম্ভাবনাকে সামনে রেখেই সম্প্রতি নিউ আলিপুর কলেজে হয়ে গেল একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ আলোচনা সভা। কলেজের সাংবাদিকতা ও গণজ্ঞাপন বিভাগ, হেরিটেজ স্টাডি সেন্টার এবং এনসিসির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেমিনারের মূল বিষয় ছিল ‘বাংলার শিল্প: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’। স্বাধীন ভারতের প্রথম শিল্প ও সরবরাহ মন্ত্রী শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে এদিনের অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।
উদ্বোধনী পর্বের পর আলোচনার মূল সুর বেঁধে দেন সভার প্রধান বক্তা তথা বিশিষ্ট আইনজীবী ও বিজেপি মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার। বাংলার বিগত ৪০০ বছরের বাণিজ্যিক ইতিহাসের এক সুদীর্ঘ খতিয়ান টেনে তিনি বলেন যে, এই মাটির শিল্পায়নের ইতিহাস অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং তা গোটা দেশকে পথ দেখিয়েছে। তবে সোনালী অতীতের গৌরবগাথা শোনানোর পাশাপাশি, বিগত কয়েক দশকে এ রাজ্যে বিনিয়োগের গ্রাফ তরতরিয়ে নেমে যাওয়ার পেছনে প্রশাসনিক গাফিলতি ও নানা নীতিগত জটিলতার কথা স্পষ্ট ভাষায় মেনে নেন তিনি। দেবজিৎবাবুর মতে, জমিনীতির সঠিক স্থায়িত্ব এবং আইনি স্বচ্ছতা যদি না থাকে, তবে কোনো বড় কর্পোরেট বা বিনিয়োগকারী এই রাজ্যে কোটি কোটি টাকা ঢালতে ভরসা পাবেন না। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার মূলত এই লাল ফিতের ফাঁস ও প্রতিকূল পরিবেশটাই বদলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে চাইছে বলে তিনি দাবি করেন।
একই সঙ্গে উপস্থিত কলেজ পড়ুয়াদের উদ্দেশে তাঁর স্পষ্ট বার্তা ছিল, এখন আর প্রথাগত চাকরির ভরসায় হাত গুটিয়ে বসে থাকার সময় নেই। বরং কেন্দ্র ও রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো এবং নতুন নতুন স্টার্ট-আপ বা ব্যবসা শুরু করার দিকেই তরুণ প্রজন্মের অনেক বেশি জোর দেওয়া উচিত।
সভাপতির আসনে বসে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী ড. মোহিত রায় কিছুটা আক্ষেপের সুরেই ফেলে আসা দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দেন। তিনি বলেন, বাংলা বরাবরই উদ্ভাবক, দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব এবং সুপ্রতিষ্ঠিত ব্যবসার এক সমৃদ্ধ ক্ষেত্র ছিল, অথচ আমরা আমাদের সেই গৌরবময় ঐতিহ্যকে উদযাপন করতে বা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছি। একসময় কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চল গোটা দেশের শিল্প ও বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে এই হতাশার আবহেও আশার আলো দেখিয়েছেন কলেজের অধ্যক্ষ ড. জয়দীপ ষড়ঙ্গী।
তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, বর্তমান ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে নতুন কিছু সৃষ্টি করার এবং সমাজ পরিবর্তনের উপযোগী সমস্যা সমাধানের বিপুল ক্ষমতা রয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তাদের যেকোনো গঠনমূলক উদ্যোগে কলেজ কর্তৃপক্ষ সবসময় পাশে থাকবে। এই সুর টেনেই সাংবাদিকতা বিভাগের প্রধান ড. অমর্ত্য সাহা মনে করিয়ে দেন যে, সরকারি সুযোগসুবিধা ও ঋণের নীতিগুলো সম্পর্কে পড়ুয়ারা যত বেশি ওয়াকিবহাল হবে, তত সহজে তারা নিজেদের ক্ষুদ্র বা মাঝারি উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারবে। আর রাজ্যে নতুন কারখানা বা ব্যবসার পরিধি বাড়লে তবেই কলেজ পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রকৃত কর্মসংস্থান তৈরি হবে।
অন্যদিকে উদ্যোক্তা শুভময় মাইতি নিজের ব্যবসায়িক লড়াইয়ের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও পথ চলার কাহিনী ছাত্রছাত্রীদের সামনে তুলে ধরেন । তিনি সাফ জানান যে, আজকের অতি-প্রতিযোগিতামূলক বাজারে টিকে থাকতে গেলে শুধু সদিচ্ছা বা ভালো আইডিয়া থাকলেই হয় না, তার জন্য প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ, উন্নত পরিকাঠামো এবং রাজ্যজুড়ে একটি শিল্প-অনুকূল পরিবেশ। বাংলাকে আবার শিল্পের হাত ধরে শীর্ষস্থানে দেখতে চাওয়াই যে তাঁর মতো নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীদের লক্ষ্য, তাও তিনি ব্যক্ত করেন। অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ভাষণে হেরিটেজ স্টাডি সেন্টারের আহ্বায়ক ড. অনিকেত মহাপাত্র এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন যে, সমাজ, রাজ্য ও দেশের মূল সমস্যাগুলো নিয়ে নিজস্ব কায়দায় আলোচনা করা শিক্ষাবিদদের এক নৈতিক কর্তব্য। আর সেই কারণেই বাংলার হারিয়ে যাওয়া শিল্প ও অর্থনৈতিক গৌরব নিয়ে নতুন করে চর্চা শুরু করতে এবং চিন্তার খোরাক জোগাতে হেরিটেজ স্টাডি সেন্টার আগামী দিনে একের পর এক বিশেষ লেকচার সিরিজের আয়োজন করবে।
তবে বক্তাদের দীর্ঘ বক্তব্যের পর অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আসল চমক অপেক্ষা করছিল, যখন আসর জমে ওঠে ছাত্রছাত্রীদের সরাসরি ও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে। তথাকথিত উন্নয়নের খতিয়ানকে কার্যত কাঠগড়ায় তুলে রূপাঞ্জনা নামের এক ছাত্রী সরাসরি জানতে চায়, বিগত বছরগুলোতে রাজ্যে বিনিয়োগের যে সমস্ত বড় বড় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কতটা আদৌ মাটিতে বাস্তবায়িত হয়েছে? সেই রেশ টেনেই সৃজনী নামের আরেক পড়ুয়া প্রশ্ন তোলে, দেশজুড়ে বাংলার শিল্পের যে নেতিবাচক ভাবমূর্তি বা পরিচিতির সংকট তৈরি হয়েছে, তা কি বর্তমান সরকার আদৌ জোড়া লাগাতে পারবে? সবচেয়ে জোরালো এবং চাঁছাছোলা ধাক্কাটি আসে সৌম্য নামের এক ছাত্রের মাইক্রোফোন থেকে। সে কোনো রাখঢাক না রেখে সরাসরি প্রশ্ন করে যে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ মুক্ত একটা সুস্থ ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ তৈরি করতে প্রশাসনের আসল পরিকল্পনা ঠিক কী? তরুণদের এই ধারালো ও নির্ভীক প্রশ্নবাণ মঞ্চে উপস্থিত অতিথিদের কিছুটা রক্ষণাত্মক করতে বাধ্য করলেও, তা এ কথাই প্রমাণ করে দিল যে, এ রাজ্যের শিল্পায়ন ও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বর্তমান প্রজন্ম কতটা চিন্তিত এবং সচেতন। রাজনীতির চেনা তরজা ও চকমকি বিজ্ঞাপনের বাইরে গিয়ে বাংলার বন্ধ কারখানার সাইরেন কি তবে এই তরুণদের হাত ধরেই আবার নতুন সুরে বেজে উঠবে? উত্তরটা হয়তো লুকিয়ে আছে কেবলই সময়ের গর্ভে।



