জলপথে সরাসরি চিনের সঙ্গে জুড়ছে কলকাতা, খুলছে অর্থনীতির নয়া দিগন্ত!

কলকাতা: পূর্ব ভারতের বাণিজ্য মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। জলপথে সরাসরি চিনের সঙ্গে কলকাতার (Kolkata China shippin) সংযোগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যার হাত…

kolkata-direct-waterway-china-shipping-economic-boost

কলকাতা: পূর্ব ভারতের বাণিজ্য মানচিত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। জলপথে সরাসরি চিনের সঙ্গে কলকাতার (Kolkata China shippin) সংযোগ আরও শক্তিশালী হচ্ছে, যার হাত ধরে শহরের বন্দরকেন্দ্রিক অর্থনীতিতে আসছে উল্লেখযোগ্য গতি। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি পোর্ট (এসপিএমপি) কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চিন-কলকাতা সরাসরি শিপিং পরিষেবার সাফল্যের পর এবার পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে সাপ্তাহিক সরাসরি জলপথ পরিষেবা বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে খরচ কমার পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময়ও উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে বলে আশাবাদী বন্দর কর্তৃপক্ষ ও শিল্পমহল।

Advertisements

২০২৪ সালের জুলাই মাসে চিন-কলকাতা সরাসরি কন্টেনার শিপিং পরিষেবা চালু হয়েছিল। আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থা Pacific International Lines-এর সহযোগিতায় শুরু হওয়া এই রুট অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা পায়। আগে যেখানে ট্রান্সশিপমেন্টের জন্য সিঙ্গাপুর বা অন্যান্য বন্দরে পণ্য নামাতে হত, সেখানে এখন সরাসরি চিন থেকে কলকাতায় পণ্য আসছে। ফলে পরিবহন ব্যয় যেমন কমেছে, তেমনই সময় বাঁচছে গড়ে ৭–১০ দিন।

   

বন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগের ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক পণ্য পরিবহনের উপর। ২০২৫-২৬ আর্থিক বছরের প্রথম ত্রৈমাসিকে কলকাতা বন্দরে কার্গো ট্রাফিক বেড়েছে প্রায় ২১ শতাংশ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বন্দর পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। নতুন মোবাইল হারবার ক্রেন যুক্ত হওয়ায় জাহাজের টার্নঅ্যারাউন্ড টাইম পাঁচ দিন থেকে কমে চার দিনে নেমে এসেছে। এর ফলে একই সময়ে বেশি জাহাজ পরিষেবা দিতে পারছে বন্দর।

কলকাতা বন্দর দীর্ঘদিন ধরেই পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব ভারতের ‘গেটওয়ে’ হিসেবে পরিচিত। তবে আধুনিকায়নের অভাব এবং প্রতিযোগী বন্দরের চাপে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছিল এই বন্দর। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে কেন্দ্র সরকারের ‘পোর্ট লেড ডেভেলপমেন্ট’ নীতির আওতায় কলকাতা বন্দরের অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানো হয়েছে। কন্টেনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বৃদ্ধি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স—সব মিলিয়ে বন্দরকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করে তোলাই লক্ষ্য।

চিনের পাশাপাশি ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশের সঙ্গে সরাসরি শিপিং পরিষেবা চালু হলে পূর্ব ভারতের রপ্তানি শিল্প বড় সুবিধা পাবে। চা, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত দ্রব্য, ইঞ্জিনিয়ারিং গুডস এবং কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন বাজার খুলে যাবে। একই সঙ্গে এই দেশগুলি থেকে কাঁচামাল ও ভোগ্যপণ্য আমদানিও সহজ হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, জলপথে সরাসরি সংযোগ বাড়লে শুধু কলকাতা নয়, গোটা পূর্ব ভারত উপকৃত হবে। ওড়িশা, ঝাড়খণ্ড, বিহার এমনকি উত্তর-পূর্ব ভারতের শিল্প ও বাণিজ্য ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে। পরিবহন খরচ কমলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় কমবে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রাখবে ভারতীয় পণ্যকে।

বন্দর এলাকার দৃশ্যও বদলাচ্ছে দ্রুত। ব্যস্ত কন্টেনার টার্মিনাল, সারি সারি ক্রেনের তৎপরতা এবং নোঙর করা বিশাল জাহাজ—সব মিলিয়ে কলকাতা আবারও ফিরে পাচ্ছে তার বাণিজ্যিক জৌলুস। বন্দরকেন্দ্রিক কর্মসংস্থান বাড়ার সম্ভাবনাও উজ্জ্বল। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাজার হাজার নতুন চাকরির সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সব মিলিয়ে, জলপথে সরাসরি চিন ও অন্যান্য এশীয় দেশের সঙ্গে কলকাতার সংযোগ শুধু একটি পরিবহন উদ্যোগ নয়, বরং এটি পূর্ব ভারতের অর্থনীতির জন্য এক নতুন দিগন্তের সূচনা। সঠিক পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ বজায় থাকলে আগামী দিনে কলকাতা বন্দর আবারও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করবে—এমনটাই আশা শিল্পমহলের।

Advertisements