ওয়াগন নির্মাণ ইউনিট গড়তে ২৮২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে ভারতীয় রেলওয়ে

ভারতীয় রেলওয়ে (Indian Railways) তেলঙ্গানার কাজিপেটে একটি রেলওয়ে উৎপাদন ইউনিট তৈরির জন্য ৫২১.৩৬ কোটি টাকার পরিকল্পনা করেছে, যেখানে আধুনিক রোলিং স্টক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা…

Indian Railways, Wagon Manufacturing Unit, Telangana, Railway Investment,

ভারতীয় রেলওয়ে (Indian Railways) তেলঙ্গানার কাজিপেটে একটি রেলওয়ে উৎপাদন ইউনিট তৈরির জন্য ৫২১.৩৬ কোটি টাকার পরিকল্পনা করেছে, যেখানে আধুনিক রোলিং স্টক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা থাকবে। সরকারের তরফে বুধবার জানানো হয়েছে যে, এই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ২৮২.১ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। এই ইউনিটটি তেলঙ্গানার হনুমকোন্ডা জেলার কাজিপেটে স্থাপিত হচ্ছে এবং এটি ভারতীয় রেলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

কাজিপেটকে একটি পৃথক রেল ডিভিশন হিসেবে প্রতিষ্ঠার দীর্ঘদিনের জনগণের দাবির প্রেক্ষিতে, কংগ্রেস সাংসদ কাদিয়াম কাব্য লোকসভায় তেলঙ্গানায় চলমান রেল প্রকল্পগুলোর, বিশেষ করে কাজিপেট রেলওয়ে ওয়াগন উৎপাদন ইউনিটের কাজ দ্রুত শেষ করার জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা জানতে চেয়েছেন। এর জবাবে রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব লিখিত বিবৃতিতে বলেন, “ভারতীয় রেলে ডিভিশন গঠন করা হয় আকার, কাজের চাপ, অ্যাক্সেসিবিলিটি, ট্রাফিক প্যাটার্ন এবং অন্যান্য অপারেশনাল ও প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে, যা অর্থনীতি ও দক্ষতার চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। সেকেন্দ্রাবাদ ডিভিশন তার এখতিয়ারের মধ্যে থাকা লাইনগুলোর, যার মধ্যে কাজিপেটও রয়েছে, চাহিদা পূরণ করছে এবং বর্তমান ব্যবস্থা সন্তোষজনকভাবে কাজ করছে।”

   

মন্ত্রী আরও বলেন, “রোলিং স্টক উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামোর সৃষ্টি বা উন্নয়ন ভারতীয় রেলে একটি অবিচ্ছিন্ন প্রক্রিয়া এবং এটি অপারেশনাল ও ট্রাফিক প্রয়োজনীয়তার উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়।” তিনি জানান, “ভারতীয় রেল তেলঙ্গানার কাজিপেটে ৫২১.৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি রেলওয়ে উৎপাদন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে, যা বিভিন্ন ধরনের আধুনিক রোলিং স্টক তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে সক্ষম হবে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কাজে ২৮২.১ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।”

Advertisements

কাজিপেটে এই রেলওয়ে উৎপাদন ইউনিটটি ভারতীয় রেলের ক্রমবর্ধমান ওয়াগনের চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। এই ইউনিটটি প্রথম বছরে ১,২০০ ওয়াগন উৎপাদনের ক্ষমতা রাখবে, যা দ্বিতীয় বছর থেকে বাড়িয়ে ২,৪০০ ওয়াগনে উন্নীত করা হবে। এটি ভারতীয় রেলের মালবাহী পরিবহন ক্ষমতা ১,৬৫০ মিলিয়ন টন থেকে ৩,০০০ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার লক্ষ্যে একটি বড় পদক্ষেপ। বর্তমানে ভারতীয় রেলের চারটি উৎপাদন ইউনিট বছরে ২৩,০০০ ওয়াগন তৈরি করে, যেখানে চাহিদা রয়েছে ৩০,০০০ ওয়াগনের। কাজিপেট ইউনিট এই ঘাটতি অনেকটাই পূরণ করবে।

২০২৩ সালের ৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৬০ একর জমির উপর নির্মিত এই ইউনিটে আধুনিক প্রযুক্তি যেমন রোবোটিক পেইন্টিং, অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উপকরণ সংরক্ষণ ও পরিচালনার জন্য আধুনিক সুবিধা থাকবে। এটি সরাসরি ১,২০০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে এবং আশপাশের এলাকায় সহায়ক শিল্পের বিকাশে সহায়তা করবে।

কাজিপেটে এই উৎপাদন ইউনিট স্থাপন তেলঙ্গানার অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা পালন করবে। স্থানীয় শিল্পের প্রচার এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে এটি অঞ্চলের সামাজিক-অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে অবদান রাখবে। দক্ষিণ মধ্য রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক অরুণ কুমার জৈন বলেন, “কাজিপেটের অবস্থান চেন্নাই, মুম্বাই, কলকাতা এবং বেঙ্গালুরুর দিকে নতুন তৈরি ওয়াগন পরিবহনের জন্য আদর্শ। এটি তেলঙ্গানার জন্য গর্বের বিষয়, কারণ এটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।”

এই প্রকল্পটি ‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রাথমিকভাবে কাজিপেটে একটি ওয়াগন মেরামতি কর্মশালা (পিরিয়ডিক ওভারহলিং ইউনিট) স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল, যা প্রতি মাসে ২০০ ওয়াগন মেরামতের ক্ষমতা রাখত। তবে, রেলের ওয়াগনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ উৎপাদন ইউনিটে রূপান্তরিত করা হয়েছে।

এই প্রকল্পের সমাপ্তি বিভিন্ন কারণের উপর নির্ভরশীল, যেমন রাজ্য সরকারের দ্রুত জমি অধিগ্রহণ, বন বিভাগের অনুমোদন, খরচ ভাগাভাগি প্রকল্পে রাজ্যের অংশ জমা দেওয়া, প্রকল্পের অগ্রাধিকার, অবকাঠামো স্থানান্তর, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং জলবায়ু পরিস্থিতি। রেলমন্ত্রী বৈষ্ণব জানিয়েছেন যে, এই সমস্ত বিষয় বিবেচনা করে প্রকল্পটি এগিয়ে চলেছে। ২০২৩ সালে রাজ্য সরকার ১৬০ একর জমির মধ্যে ১৫০ একর অধিগ্রহণ করেছে, এবং বাকি জমি সংযোগের জন্য রেলওয়ে ১.৫ একর জমির জন্য অনুরোধ জানিয়েছে।

প্রকল্পটির বাজেটও সংশোধন করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ৫২১ কোটি টাকার পরিকল্পনা থাকলেও, সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী এটি ৭১৬ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। এখন পর্যন্ত প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে জানা গেছে।

তেলঙ্গানায় রেলের উন্নয়নের জন্য কেন্দ্র সরকার ৪১,৬৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে, যার মধ্যে নতুন লাইন, বিদ্যুৎকরণ, স্টেশন আধুনিকীকরণ এবং কাজিপেট ইউনিটের মতো প্রকল্প রয়েছে। ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ২০টি প্রকল্পে ৯,৯৫৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যার মধ্যে ৪৭৪ কিলোমিটার লাইন চালু হয়েছে।

তেলঙ্গানা সরকার এবং কেন্দ্রের মধ্যে এই প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। রাজ্যের মন্ত্রী কে টি রামা রাও কেন্দ্রের উপর অভিযোগ করেছেন যে, কাজিপেটে কোচ ফ্যাক্টরির পরিবর্তে শুধুমাত্র একটি ওয়াগন ইউনিট দেওয়া হচ্ছে, যেখানে গুজরাটে ২১,০০০ কোটি টাকার কোচ ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়েছে। তবে, কেন্দ্র জানিয়েছে যে, এই ইউনিটটি তেলঙ্গানার শিল্প বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

কাজিপেটে রেলওয়ে উৎপাদন ইউনিট ভারতীয় রেলের আধুনিকীকরণ এবং তেলঙ্গানার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ২৮২.১ কোটি টাকার বিনিয়োগের সঙ্গে এই প্রকল্পটি দ্রুত এগিয়ে চলেছে এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এটি শুধুমাত্র রেলের চাহিদা পূরণ করবে না, বরং স্থানীয় জনগণের জন্য কর্মসংস্থান ও শিল্প বিকাশের নতুন দ্বার উন্মোচন করবে।